Thursday, 10.19.2017, 05:03pm (GMT+6)
  Home
  FAQ
  RSS
  Links
  Site Map
  Contact
 
আবদুুল হাই মাশরেকী ছিলেন মূলসংস্কৃতির শিকড়ের আধুনিক কবি ; লোককবি আবদুুল হাই মাশরেকীর ৯৭তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে শিল্পকলায় দুদিনব্যা ; লোককবি আবদুুল হাই মাশরেকীর ৯৭ তম জন্মজয়ন্তী আগামী ১ এপ্রিল ২০১৬ ; আল মুজাহিদী ; ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন
::| Keyword:       [Advance Search]
 
All News  
  গুণীজন সংবাদ
  বিপ্লবী
  ভাষা সৈনিক
  মুক্তিযোদ্ধা
  রাজনীতিবিদ
  কবি
  নাট্যকার
  লেখক
  ব্যাংকার
  ডাক্তার
  সংসদ সদস্য
  শিক্ষাবিদ
  আইনজীবি
  অর্থনীতিবিদ
  খেলোয়াড়
  গবেষক
  গণমাধ্যম
  সংগঠক
  অভিনেতা
  সঙ্গীত
  চিত্রশিল্পি
  কার্টুনিস্ট
  সাহিত্যকুঞ্জ
  ফটো গ্যাল্যারি
  কবিয়াল
  গুণীজন বচন
  তথ্য কর্ণার
  গুণীজন ফিড
  ফিউচার লিডার্স
  ::| Newsletter
Your Name:
Your Email:
 
 
 
শিক্ষাবিদ
 

সরদার ফজলুল করিম






সরদার ফজলুল করিম নানা অর্থেই এক অসামান্য চরিত্র। রাজনীতি করেছেন আদর্শের, আজীবন মগ্ন ছিলেন জ্ঞানের সাধনায়। তারও চেয়ে বড় কথা, তাঁর চিন্তা আর জীবনযাপন ছিল একই সুতোয় গাঁথা। আদর্শবান এই মানুষটিকে নিয়ে লিখেছেন শিক্ষাবিদ মোজাফ্ফর আহমদ


সরল জীবন, গভীর মনন

আমাদের ছেলেবেলায় ‘সিম্পল লিভিং-হাই থিংকিং’ কথাটা নানাভাবে নানাজনে আমাদের শোনাত। আমাদের চারপাশে অনেক ব্যক্তিকে এমনই জীবন যাপন করতেও দেখেছি। কেউ হয়তো ধর্ম থেকে এর অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। কারও কারও অনুপ্রেরণার উত্স ছিল দেশাত্মবোধ এবং অথবা কোনো ভাবগত দর্শন। আমি এক শিক্ষককে জানতাম, যিনি মোটা ধুতি ও চাদর গায়ে দিয়ে সারা জীবন কাটিয়েছেন। সেই সঙ্গে তাঁর নেশা ছিল, হোমিওপ্যাথি ও কবিরাজি করা, এ জন্য কারও কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করতেন না। ছিলেন অকৃতদার এবং একটি ছোট বাড়ির একটি ঘরে স্বপাকে নিজের ক্ষুন্নিবৃত্তি সাধন করতেন। আকর্ষণীয় ছিল তাঁর বাত্সল্য এবং শিশুদের প্রতি মমতা তাঁকে খেলার মাঠে ছাত্রের বাড়িতে এবং অভিভাবকদের সঙ্গে সম্প্রীতির সম্পর্ক গড়ে তুলতে কোনো সময়ক্ষেপণ করতে হতো না। প্রাণখোলা হাসি ও সদা হাস্যময় অবয়ব যেকোনো মানুষের কাছে তাঁকে গ্রহণযোগ্য করে তুলত। তাঁর বাসায় ছিল অনেক বইয়ের এক সম্ভার। দর্শন, ইতিহাস, বিজ্ঞান, জীবনী, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলোচনা, চিকিত্সাশাস্ত্র, সাহিত্য—কোনো কিছুই তাঁর পাঠতালিকার বাইরে ছিল না। এ ছাড়া ছিল নানা পত্রপত্রিকা। হারিকেন জ্বালিয়ে প্রায় সারা রাত তিনি পড়তেন। কখন যে ঘুমাতেন, সেটা আমার জানা হয়নি। প্রত্যুষে প্রাতর্ভ্রমণ সেরে চিঁড়া, কলা আর তাঁর নিজ হাতে পাতা দই দিয়ে আহার সেরে নিতেন। বাড়িতে কাজের লোক ছিল না। নিজেই সব পরিচ্ছন্নতাকর্ম, কাপড় কাচা, রান্না—সবই করতেন। তারপর যে ছাত্রদের তাঁকে প্রয়োজন, তাদের কারও কারও বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর করতেন, পড়াতেন। সন্ধ্যার কিছু আগে প্রাণায়াম শেষে তিনি তাঁর রান্না সেরে নিতেন। সহজ-সরল রান্না—চাল, ডাল, সবজির মধ্যে কিছু মসলা দিয়ে তাঁর রান্না শেষ হতো। প্রিয় ছিল গরম গরম দুধ, সেটাও নিজে ব্যবস্থা করতেন। বাড়তি দুধের বসত দই। নিজেই পাকাতেন মাটির হাঁড়িতে। সাধারণত তিনি অন্য কোথাও খেতেন না, কিন্তু যে শিশুদের, ছাত্রদের ভালোবাসতেন, তাদের সে সময়কার ফল-ফলারি না খাইয়ে ছাড়তেন না। একজন বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকের বেতন তেমন ছিল না। তাঁর কোনো সম্পত্তি ছিল বলে শুনিনি। একটি সুন্দর পরিচ্ছন্ন ঘরে জীবন কাটিয়েছেন আনন্দিত উপলব্ধি নিয়ে। শুনেছি, বিএসসি পাস করে এলএমএফ ডাক্তারি পড়ার সময় এক রোগীর মৃত্যু হয়। তিনি নিজেকে কিঞ্চিত অবহেলার জন্য ক্ষমা করতে পারেননি। পড়াশোনা ছেড়ে দেন। আজীবনের কর্মসাধনা হিসেবে গ্রহণ করেন মানুষের সেবা এবং জ্ঞান আহরণকে। সে সাধনা ঋষিসম এ শিক্ষকের জীবনটিকে সুন্দর ও আকর্ষণীয় করে তুলেছিল। দেশ বিভাগের আগে জেলা শহরে তাঁর মৃত্যু হওয়ার আগে তিনি তাঁর দেহ চিতায় না তুলে সমাধিস্থ করার আদেশ দিয়ে গিয়েছিলেন। কেন দিয়েছিলেন তা অবশ্য জানা নেই। মনে করি যে নিম্নবিত্ত মুসলমানশ্রেণীর মধ্যে তার জীবন কেটেছে, তাঁদের প্রতি সম্মান দেখাতেই সম্ভবত তাঁর এই নির্দেশ। তাঁর মৃত্যুর পর যে সমাগম হয়েছিল, সেটা একটা জনসভার শামিল। মানুষকে ভালোবাসাই ছিল তাঁর ধর্ম এবং সহজ-সরল জীবনের মধ্য দিয়ে মানুষের পাশে প্রয়োজনে নিজেকে দাঁড় করিয়ে তিনি তাঁর ধর্ম পালন করে গেছেন।

মনে ছিল মাটি

এ কাহিনীর অবতারণা এজন্য যে ঋষিসম রসিকবাবুর কথা বললাম, তিনি বরিশাল শহরেরই লোক, যেখানে থেকে সরদার ফজলুল করিম তাঁর শিক্ষার একটি প্রস্তুতি পর্ব শেষ করেছিলেন। সরদার ফজলুল করিম এসেছিলেন সাধারণভাবে সম্পন্ন একটি কৃষক পরিবার থেকে। যেখানে সচ্ছলতাও ছিল, টানাপোড়েনও ছিল। সহজ-সরল জীবন, জ্ঞান অন্বেষণ, সদাহাস্য মুখে মানুষের সঙ্গে কথা বলা, দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা ও পরিবর্তনকে গভীরভাবে উপলব্ধি করা এবং চাহিদাকে সীমাবদ্ধ করে একটি পরিচ্ছন্ন জীবন যাপন করা সরদার ফজলুল করিমের সহজাত ছিল। তিনি কখনো ভুলে যাননি, কোন মাটি বা দেশের কোন অঞ্চল থেকে শহরে-নগরে এসেছেন। সাধারণ মানুষের সমস্যা পরিবর্তনে যে সমাজ বিনির্মাণের প্রয়োজন, সে কথাও তিনি কখনো ভুলে যাননি। কত সহজেই তিনি দুঃখ ও অভাবকে মেনে নিয়েছেন, তা যাঁরা তাঁকে কাছ থেকে জানেন, তাঁরাই বিস্ময়ের সঙ্গে উপলব্ধি করেছেন। তাঁর মেধার প্রশংসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের প্রধান শিক্ষক অধ্যাপক হরিদাস অট্টাচার্য তাঁকে যে প্রশংসাপত্র দিয়েছিলেন, সেটা যাঁরা দেখেছেন তাঁরাই বিমোহিত হয়েছেন এবং এ রকম একটি মূল্যায়ন যেকোনো ছাত্রের গর্বের বিষয় হতে পারে। অথচ সরদার ফজলুল করিম প্রবেশিকা, উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্বে যে কীর্তিমানতা রেখেছেন, তা নিয়ে তাঁকে কখনোই কোনো গর্বিত উচ্চারণ করতে শুনেছি বলে মনে পড়ে। অথচ আজকালকার অনেক শিক্ষকই নিজের পরিচয় দিতে এমন সব বিশেষণ ব্যবহার করেন, সেটা যদি তাঁরা সরদার ফজলুল করিমের অধ্যায়নকালীন কীর্তি সম্পর্কে জানতেন, তাহলে হয়তো সে জাতীয় গর্বিত উচ্চারণ থেকে তাঁরা বিরত থাকতেন। স্নাতকোত্তর পর্বের শেষেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি প্রভাষকের পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সংশ্লেষ থাকার কারণে সে চাকরিটি তিনি হারান। এ বিষয়ে তাঁর কাছ থেকে কোনো দিন কোনো আক্ষেপ শুনতে পেয়েছি বলে মনে হয় না। পরবর্তীকালে তিনি যখন আবার চাকরির জন্য দরখাস্ত করেছেন, তখন খুব সহজ-সরলভাবে ওই চাকরি পাওয়া এবং পুলিশি রিপোর্টে চাকরি যাওয়ার বিষয় দুটি এমনভাবে উল্লেখ করেছেন যে এগুলো চাকরির দরখাস্তের ফরম অনুযায়ী উল্লেখ করতে হয়, তাই সত্যনিষ্ঠ মানুষের মতো এ বিষয়টির তিনি সলজ্জভাবে অবতারণা করেছেন। আজ ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ—এগুলো নিয়ে অনেককে সত্য-মিথ্যার গর্বিত উচ্চারণ করতে শুনি। আর তখনই আমার সরদার ফজলুল করিমের বিনম্র মুখটি স্মরণ হয়। সেকালে তিনি বিদেশে পড়ার বৃত্তি পেয়েছিলেন। সে বৃত্তি নিয়ে তাঁর মেধার কারণেই অতি সহজে বিলেত থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন কোনো অসম্ভব ব্যাপার ছিল না। পরিবার থেকে তাঁর বিদেশে যাওয়ার জন্যও আদেশ-অনুরোধ-উপরোধ ছিল। কিন্তু যে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের অনুশাসনে এ বৃত্তি তিনি হেলায় ফেলে দিয়েছিলেন। বিদেশ যাওয়া আর হয়নি। পরে অবশ্য একাত্তর-উত্তরকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের চেষ্টায় বিদেশ যাওয়ার জন্য তিনি মনোনীত হলেও তাঁর বৃত্তিলাভ ঘটেনি। এ জন্যও তাঁকে কোনো দিন আক্ষেপ করতে শুনিনি। এমন তাঁর ব্যবহার ছিল, যেন এমনটিই ঘটা সঠিক ছিল। তাঁর চেয়ে কম মেধার অনেকেই বিদেশে দেশীয় ও বিদেশি বৃত্তি নিয়ে ফিরে এসেছেন। কিন্তু তাঁদের ব্যাপারে কোনো বিরূপ মন্তব্য করতেও তাঁকে শুনিনি।

অনন্য জনপ্রতিনিধি

তিনি পাকিস্তান কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলির সদস্যও হয়েছিলেন, যখন তিনি কারাগারে বন্দী এবং বয়সে তরুণ। বাম রাজনীতির মানুষজনই তাঁর মনোনয়নকে সম্ভব করেছিলেন। তাঁর নির্বাচনের সময় গুটি কয় মানুষ ছাড়া কেউ তাঁকে সম্যকভাবে চিনত না। তিনি গণপরিষদের সদস্য হিসেবে একজন নবীন জনপ্রতিনিধি হয়ে পূর্ব বাংলার স্বার্থ রক্ষায় যে উজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছিলেন, সেটি বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর বক্তব্যের যে অনুলিখন গণপরিষদের কার্যবিবরণীতে আছে, সেটি পাঠ করলেই বোঝা যায়। এখানে কোনো নেতার স্তুতি ছিল না, কথায় কথায় রাজনীতির তোষামোদি ভাষা তাঁর বক্তব্যে আসেনি। তিনি ছিলেন যুক্তিনিষ্ঠ এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারায় মানুষের অধিকার অর্জনের বিষয়ে একনিষ্ঠ। তাঁর ভাষায় কোনো অস্পষ্টতা ছিল না, কোনো যুক্তিহীনতা ছিল না, কাউকে অপমান করার চেষ্টা ছিল না। কেবলই ছিল যে বৃহত্ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হয়ে সেই গণপরিষদে গিয়েছিলেন, তাঁদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও অধিকারের বিবেচনা। আজকে আমাদের জাতীয় সংসদে জনপ্রতিনিধিদের অনেক বক্তব্য শুনি। মনে হয় দলের নেত্রী বা নেতার তোষামোদ না করলে তিনি বিপদে পড়বেন। আর বিপক্ষ দলের নেত্রী বা নেতাদের নিন্দামন্দ না করলে তাদের কার্যসম্পাদন হবে না। যুক্তিসহকারে সহজ-সরলভাবে যাদের প্রতিনিধি তারা তাদের মনের কথাটি তুলে ধরার মতো সত্যনিষ্ঠ বক্তব্য আজকালকার সংসদের কার্যবিবরণীতে পাওয়া যায় না। সেই তরুণ রাজনীতিক সরদার ফজলুল করিম আর কিন্তু নির্বাচন করেননি। একটি সংবিধান রচনার পরই তাঁর ওপর যে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল, সেটি তিনি পালন করেছেন বলে ধরে নিতে হয়। গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের প্রতি তাঁর একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আকর্ষণ ছিল। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল তাঁর রাজনৈতিক সহগামীদের আদর্শিক প্রেরণা। যত দূর মনে পড়ে, সরদার ফজলুল করিমের কথায় তিনি কখনো নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন না। অথচ এই গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্রের আদর্শিক অন্বেষণে তাঁর অনেক সময় কেটেছে এই বামপন্থীদের সঙ্গেই এবং এদের কারণেই তাঁর চাকরি গেছে, তিনি জেল খেটেছেন এবং এদের নির্দেশনায় তিনি বৃত্তি পেয়েও বিদেশে যাওয়া থেকে বিরত থেকেছেন। এই একনিষ্ঠতা ও শৃঙ্খলার সঙ্গে আদর্শিক নির্দেশ পালন করে যাওয়া কম কথা নয়।

এক জীবনে অনেক কিছু

সরদার ফজলুল করিমকে আমরা অনুবাদক হিসেবে দেখেছি। তিনি প্লেটো, এরিস্টটলসহ বা রাজনৈতিক দর্শনবিষয়ক নানা অনুবাদ করেছেন। অনুবাদকর্ম একটি কঠিন বিষয়, ইংরেজি ভাষায় দখল প্রয়োজন, বাংলা ভাষায় তো বটেই, তার ওপর দর্শনের যে শব্দগুলো, সেগুলোও যথার্থ উপলব্ধির প্রয়োজন থাকে। সরদার ফজলুল করিম দুটো ভাষাই ভালো জানেন। আর দর্শনে তাঁর ব্যুত্পত্তি তাঁর শিক্ষকের ভাষায় অনবদ্য। অনুবাদের জন্য তিনি যথেষ্ট শ্রম দিয়েছেন, যাকে ইংরেজিতে ‘লেবার অব লাভ’ বলা চলে। এ কাজ করতে গিয়ে তিনি বাংলায় দর্শন কোষ তৈরি করেছেন, যেটি দর্শনের যেকোনো ছাত্রের কাছে আকর্ষণীয়। জ্ঞানচর্চায় এমন শৃঙ্খলা আজকের শিক্ষকদের ভেতর অনেকটাই অনুপস্থিত। জ্ঞান আহরণ একটি সাধনার ব্যাপার, কেবল পাঠের নয়। বিষয়টি অন্তরে অনুভব করতে হয়। সরদার ফজলুল করিম তাঁর অনুবাদকর্মে তাঁর অনুভূত ও আহরিত জ্ঞানের সঙ্গে নিজের সৃজনশীল জ্ঞানানুভূতিকে সমন্বিত করতে পেরেছেন। এটাই তাঁর অনুবাদকর্মের সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক। বাংলা একাডেমীতে বিভাগীয় প্রধানের কাজ করতে করতে কিছু সময় পাকিস্তানি সেনাদের অত্যাচার সহ্য করে একাত্তর-উত্তরকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে তিনি নিযুক্ত হন অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের উত্সাহে ও চেষ্টায়। মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি তো ওপারে যাননি, কিন্তু এপারেও তাঁর অতীত রাজনৈতিক সংশ্লেষের জন্য নির্ভয়ে থাকা সম্ভব ছিল না। সেই দিনগুলো তাঁর পরিবার-পরিজন নিয়ে সতর্কভাবে এখানে-সেখানে কেটেছে। তাঁর স্ত্রী নিজে কর্মরতা ছিলেন, তাঁকেও এ বিষয়ে সতর্ক হতে হয়েছে। ছেলেমেয়েদের শিক্ষা বিঘ্নিত হয়েছে। সরদার ফজলুল করিম এ বিষয়ে সাধারণত আলাপচারিতা করেন না। সদাহাস্যময় কিছু বক্তব্যের মাধ্যমে এ অধ্যায়ের ইতি টানেন। এই প্রচারবিমুখতা একটি আকর্ষণীয় গুণ। আমাদের এ দেশে এই বিজ্ঞাপনের যুগে এবং নানা সংগঠনের কারণে এবং গণমাধ্যমের উদারতায় যে জাতীয় প্রচার-সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তার থেকে তিনি নিজেকে দূরে পরিশুদ্ধ রেখে জীবন যাপন করেছেন। যাঁরা এটা অনুভব করতে পারেন না, তাঁরা একটি মেধাবী, বিনয়ী, জ্ঞান-অনুসন্ধিত্সু শিক্ষকের চরিত্র বুঝতে ব্যর্থ হন। এখানেই সরদার ফজলুল করিম অনন্য।
সরদার ফজলুল করিম তাঁর টেপরেকর্ডারের সাহায্যে বেশ কয়েকটি সাক্ষাত্কার নিয়েছেন—অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক ও শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তাঁর অন্যতম ও উল্লেখযোগ্য দুটি সাক্ষাত্কার। সাক্ষাত্কার নেওয়ার যে একটি শৈল্পিক দিক আছে, সেটি এই সাক্ষাত্কার দুটি পড়লে বোঝা যায়। যাঁর সাক্ষাত্কার নেওয়া, তাঁর সম্পর্কে কিছু ধারণা থাকতে হয় এবং তাঁর জীবনকর্মের যে বিষয়ের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে, সে বিষয়গুলো সম্পর্কেও জানা থাকা প্রয়োজন। সরদার ফজলুল করিম এ দুটি দিকেই দৃষ্টি দিয়েছেন। ফলে সাক্ষাত্কার দুটি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। সত্যনিষ্ঠ সরদার ফজলুল করিম টেপরেকর্ডে যতটুকু পেয়েছেন, ততটুকুই সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। এটিকে বিশেষ সম্পাদনা করে ভিন্নতর অভিধা সৃষ্টির চেষ্টা হয়নি। তবে অনেক সময় সাক্ষাত্কারের পাঠকদের সুবিধার জন্য একজাতীয় টীকার প্রয়োজন হয়। সরদার ফজলুল করিম সেটুকু করতেও রাজি ছিলেন না, যদি বা তাঁর কারণে যাঁর সাক্ষাত্কার নেওয়া হয়েছে, তিনি যা বলেছেন তার অন্যথা ঘটে। অন্যদিকে সরদার ফজলুল করিম যখন এখানে-সেখানে নিজের সম্বন্ধে সাক্ষাত্কার দিয়েছেন, সেখানে তিনি আমার ধারণায় কৃপণতা অবলম্বন করেছেন এবং পাছে অতি উচ্চারণ ঘটে, সেই ভয়ে সত্যনিষ্ঠ থাকতে কম বলাকেই বেছে নিয়েছেন। আমি মনে করি, সরদার ফজলুল করিমের পুরো জীবনের কর্মের ওপর একটি দীর্ঘ সাক্ষাত্কার কেউ গ্রহণ করলে পরবর্তী প্রজন্ম এই বিরলপ্রজ, সহজ-সরল মানুষটির প্রকৃত মূল্য বুঝতে পারত।

সারল্যই শক্তি

সরদার ফজলুল করিমের সঙ্গে আমার পরিচয় ষাটের দশক থেকে। কিন্তু এটা হতে পারত ১৯৪০ থেকে। তিনি বরিশাল জেলা স্কুলের মেধাবী ছাত্র ছিলেন। সেকালের প্রবেশিকাশিক্ষায় প্রথম বিভাগ পাওয়া একটি দুরূহ কর্ম ছিল। সরদার ফজলুল করিম ১৯৪০ সালের প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ পেয়েছিলেন। বরিশাল জেলা স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন খান সাহেব সেরাজউদ্দিন আহমদ। আলীগড়ের প্রথম শ্রেণী পাওয়া কৃতী ছাত্র ঢাকার টিচার্স ট্রেনিং কলেজের প্রথম ব্যাচের প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়া ছাত্র, তিনি ইন্ডিয়ান সিনিয়ার এডুকেশন সার্ভিসের সদস্য ছিলেন। স্কুলের শৃঙ্খলার ব্যাপারে তাঁর আপস ছিল না। মেধাবী ছাত্রর জন্য তাঁর ছিল বাত্সল্য। তাঁর সম্পর্কে নানাজনের লেখায় উল্লেখ পাওয়া যায়। অক্সফোর্ডের ইমেরিটাস অধ্যাপক তপন রায়চৌধুরী বরিশাল জেলা স্কুলেরই ছাত্র, সরদার ফজলুল করিমেরই সমসাময়িক। তপন প্রবেশিকা পরীক্ষায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম হয়েছিলেন। তাঁর লিখিত বাঙালনামায় এই হেডমাস্টারের কথা উল্লেখ করতে ভোলেননি। অধ্যাপক আবুল ফজল যখন স্কুলের শিক্ষক, বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে চট্টগ্রামেই এ মানুষটির সাহচর্য পেয়েছিলেন, যেটি তাঁর লেখাচিত্রে উল্লিখিত আছে। খান সাহেব সেরাজউদ্দিন আহমদ ইংরেজি পড়াতেন, বিশেষ করে ওপরের ক্লাসে। তাঁর লেখার ধরন ছিল সরল বাক্যে ভাব প্রকাশ করা। যৌগিক বাক্য তাঁর খুব পছন্দ ছিল না। সরদার ফজলুল করিমের যতটুকু ইংরেজি লেখা আমি দেখেছি, তাতে তাঁর মধ্যেও সহজভাবে সরল বাক্যে ভাব প্রকাশের প্রবণতা দেখতে পেয়েছি। ভাষা নাকি মানুষের মন ও চরিত্রের পরিচায়ক। এই সহজভাবে সরল বাক্যে প্রকাশ সহজ-সরল সরদার ফজলুল করিমের চারিত্রিক পরিচিতিকে তুলে ধরে। খানসাহেব সেরাজউদ্দিন আহমদ আমার মাতামহ। সে কারণে পরিচয়ের পর থেকেই সরদার ফজলুল করিমের স্নেহধন্য হয়েছি। তিনি যেকোনো সময় তাঁর হেডমাস্টারের কথা উঠলেই এমন একটা সমীহ প্রকাশ করতেন, যেটি একজন সার্থক শিক্ষকের প্রতি তাঁর এক সার্থক ছাত্রের প্রণতি জানানোর মতোই। আমাদের দেশে আজ ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক এমন এক পর্যায়ে নেমেছে যে সেটাকে বেদনাদায়ক বলা চলে। আমরা যাঁরা পুরোনো কালে ছাত্র-শিক্ষকের শাসন, বাত্সল্য ও আনুকূল্যের উপকারভোগী হয়েছি, তাঁরা একজন গুণী শিক্ষকের ছাত্রের মন ও মনন গঠনে যে ভূমিকা, সেটা শ্রদ্ধার সঙ্গেই স্মরণ করতে পারি। সরদার ফজলুল করিম স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক গুণী শিক্ষকের সাহচার্য পেয়েছেন এবং পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তিনি এই গুণী শিক্ষকদের সঙ্গেই সময় কাটাতে ভালোবাসতেন। আমি যত দূর জানি, তিনি যাঁদের পড়িয়েছেন অথবা যেসব ছাত্র তাঁর সঙ্গলাভ করে ধন্য হয়েছে, তাঁদের অনেকেরই শ্রদ্ধামিশ্রিত সঙ্গ তিনি লাভ করেন ও উপভোগ করেন। একজন শিক্ষকের জীবনে এটি একটি পরম পাওয়া।

বিলাসবর্জিত জীবন

শেষ যে কথা বলে ইতি টানতে চাই, সেটা হলো বিলাসবিবর্জিত একটি সুন্দর জীবন, নানা সমস্যাসংকুল অবস্থায় তিনি কাটিয়েছেন। তিনি কখনো গ্রামের কথা ভোলেননি। যে পরিবেশ থেকে উঠে এসেছেন, সে কথাও কখনো বিস্মৃত হননি। বরিশাল তাঁকে মাঝেমধ্যেই টেনেছে এবং সেখানে তিনি বারেবারেই ফিরে গেছেন। এই যে মাটির টান, যেটা নাড়ির টানে রূপান্তরিত হয়, সেটা আজকে দেশান্তরমুখী মানুষের মননে খুঁজে পাওয়া বড় মুশকিল। সরদার ফজলুল করিম তাঁর পৈতৃক পরিবার-পরিজন বিশেষ করে বড় ভাইকে সব সময়ই শ্রদ্ধা করে এসেছেন। যৌথ পরিবারের এই সংস্কৃতি আজকে বিলীয়মান। সরদার ফজলুল করিম যৌথ পরিবারের সুন্দর দিকগুলোকে নিজের মধ্যে ধারণ করেছেন। কিন্তু সে পরিবার বিস্তৃত হয়ে তাঁর কর্মক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর জীবনে সৌহার্দ্য, হূদ্যতা, সম্প্রীতি সুন্দর মন ও মননের সমন্বয় ঘটিয়েছিল। যাঁরা তাঁর সংস্পর্শে এসেছেন, তাঁরাই এটি উপলব্ধি করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নিয়ে তিনি পুরোনো ঢাকার সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজ যা পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়েছিল, সেখানে পড়াতে ভালোবাসতেন। স্বল্পব্যয়ে মধ্যবিত্তের জন্য উচ্চশিক্ষা তাঁর জন্য একটা আদর্শিক অবস্থান ছিল। বর্তমানে বিত্তবানদের জন্য যে শিক্ষাপণ্যের পসরা, নানা বিজ্ঞাপনে বিজ্ঞাপিত হয়, সেটি তাঁকে আকর্ষণ করেনি। তিনি পুরোনো ঢাকায় যেতে নানা অসুবিধার সম্মুখীন হতেন, দুর্ঘটনায়ও পড়েছেন। তবুও তাঁর আদর্শিক অবস্থান থেকে নিজেকে কখনোই সরিয়ে আনেননি। যাঁদের জীবনে নানা কারণে বিশেষ করে বিত্তের কারণে উচ্চশিক্ষা বিঘ্নিত হয়, তাদের প্রাণে জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালানো তাঁর কাছে একটা ব্রতের মতো ছিল। তাঁর এই সহজ-সরল জীবনে সহায়তা করেছেন তাঁর মহীয়সী সহধর্মিণী। তাঁর সন্তানেরাও পিতার সীমিত আয় এবং আদর্শিক বিষয়টিকে এমনভাবে গ্রহণ করেছিলেন, যাতে সরদার ফজলুল করিম বিব্রত না হন। এখন যে বয়সে তিনি উপনীত, সেখানে নানা রকমের শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। সেটাকেও তিনি দার্শনিক মননে গ্রহণ করেছেন। এ দেশের অনেক শিক্ষার্থী সরদার ফজলুল করিম সম্পর্কে জানে না। এটা তাদের দুর্ভাগ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি সরদার ফজলুল করিমকে চাকরি থেকে অবসরের পর স্কলার ইন রেসিডেন্স করে ছাত্রদের তাঁর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হতো, তাহলে নতুন প্রজন্ম উপকৃত হতো। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগহীনতা নিজেদের কতখানি দীন করে তোলে, অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক ও সরদার ফজলুল করিমের বিষয়টি অনুধাবন করলে আমরা বুঝতে পারব। আশা করি, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষকরাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে একজন আদর্শ শিক্ষককে যথোচিত সম্মান দেখাতে অনুপ্রাণিত বোধ করবে। তাহলেই আমাদের বঞ্চিত প্রজন্ম কিছুটা আলোর সন্ধান পাবে। শুরুতে রসিকবাবুর কথা যে বলেছিলাম, তিনি নিজেকে ছাত্রদের ভেতরে স্বীয় উদ্যোগে ছড়িয়ে দিতেন। কিন্তু আজকালকার জটিল পৃথিবীতে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ অত্যন্ত আবশ্যকীয়। আমি কামনা করি, সরদার ফজলুল করিম রোগমুক্তভাবে দীর্ঘায়ু হবেন এবং যাঁরা তাঁর সন্নিকটে আসেন, তাঁদের মধ্যে তিনি জ্ঞান ও আদর্শের প্রদীপ জ্বালিয়ে যাবেন।

Comments (0)        Print        Tell friend        Top


Other Articles:
 মুহাম্মাদ কুদরাত-এ-খুদা
প্রফেসর জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী
কবীর চৌধুরী
কাজী মোতাহার হোসেন
অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী’
জনাব যতীন সরকার
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
হেনা দাস
অজিতকুমার গুহ
কাজী রফিকুল আলম



 
  ::| Events
October 2017  
Su Mo Tu We Th Fr Sa
1 2 3 4 5 6 7
8 9 10 11 12 13 14
15 16 17 18 19 20 21
22 23 24 25 26 27 28
29 30 31        
 
::| Hot News
সরদার ফজলুল করিম
 মুহাম্মাদ কুদরাত-এ-খুদা
কবীর চৌধুরী
অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী’
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

Online News Powered by: WebSoft
[Top Page]