গুণীজন ডটকম Life story of Bangladeshi poets writers & famous persons

অনন্য আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ
Monday, 10.29.2012, 05:24pm (GMT6)




আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ এমন একজন ব্যক্তি, যিনি আজীবন প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের সেবা করে গেছেন। বাঙালি লেখকেরা যখন পাশ্চাত্য সাহিত্যের প্রভাবে ও অনুরাগে আধুনিক বাংলা সাহিত্য সৃষ্টিতে নিজেদেরকে নিয়োজিত করেছেন, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ তখন প্রাচীন ও মধ্যযুগের পুঁথি সংগ্রহ, পুঁথির রণাবেণ এবং পুঁথি সম্পাদনায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। মূলত পুঁথি সংগ্রহ, পুঁথির রণাবেণ ও পুঁথি সম্পাদন ছিল তার জীবনের ব্রত।


আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ১৮৬৯, মতান্তরে ১৮৭১ সালে চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া থানার অন্তর্গত সুচক্রদণ্ডী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মুনশী নূরউদ্দীন (১৮৩৮-৭১)। তার মাতা মিস্রীজান প্রখ্যাত পাঠান তরফদার দৌলত হামজা বংশের মেয়ে ছিলেন। তার পড়াশোনা শুরু হয়েছিল বাড়ির দহলিজেই। সেখানেই তিনি আরবি-ফারসি ও বাংলায় পড়া শুরু করেন। অতঃপর তিনি সুচক্রদণ্ডী মধ্যবঙ্গ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এক বছর পড়াশোনা  করে তিনি পটিয়া উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৮৯৩ সালে প্রবেশিকা পরীায় দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। চট্টগ্রাম কলেজে দু’বছর এফএ পড়ার পর পরীার আগে তিনি টাইফয়েড এ আক্রান্ত হন। ফলে তার আর এফএ পরীা দেয়া হয়নি। এখানেই তার উচ্চ শিার সমাপ্তি ঘটে।


আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ বাল্যকাল থেকেই পুঁথিপত্রের প্রতি খুবই আগ্রহী ছিলেন। সারা জীবন তার নেশা ছিল দৈনিক-সাপ্তাহিক-পাকি-মাসিক ইত্যাদি পত্রিকা পাঠ করা এবং সংগ্রহ করা। তার কর্মজীবন শুরু হয় চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল স্কুলে শিকতা দিয়ে এবং পরবর্তীকালে তিনি সীতাকুণ্ড মধ্য ইংরেজি স্কুলের অস্থায়ী প্রধান শিক হন। চট্টগ্রামে প্রথম সাব-জজ আদালতে অ্যাপ্রেন্টিস হিসেবে কাজ করেন। পরে কবি নবীন সেনের সুপারিশে চট্টগ্রাম কমিশনার অফিসে যোগদান করেন। ১৯৩৪ সালে তিনি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন।


সাহিত্য, পূর্ণিমা ইত্যাদি পত্রিকায় লেখালেখির মাধ্যমে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ শিতি সমাজে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তার সম্পাদিত গ্রন্থগুলো হচ্ছে কবিবলভ এঁর সত্যনারায়ণের পুঁথি (১৯১৫), দ্বিজ রতিদেবের মৃগলুব্ধ (১৯১৫), রামরাজার মৃগলুব্ধ সম্বাদ (১৯১৫), দ্বিজ মাধবের গঙ্গামঙ্গল (১৯১৬), আলীরাজার জ্ঞানসাগর (১৯১৭), বাসুদেব ঘোষের শ্রীগৌরাঙ্গ সন্ন্যাস (১৯১৭), মুক্তারাম সেনের সারদামঙ্গল (১৯১৭), শেখ ফয়জুলাহর গোরবিজয় (১৯১৭), আলাওলের পদ্মাবতী (খণ্ডাংশ, ১৯৭৭) ইত্যাদি। তিনি আলাওলের পদ্মাবতী (খণ্ডাংশ) সম্পাদনা করেছিলেন, কিন্তু জীবিতকালে তা পুস্তকাকারে দেখতে পাননি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্য সমিতি তার মৃত্যুর অনেক পরে ১৯৭৭ সালে তা প্রকাশ করে।


আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের সংকলিত ও রচিত গ্রন্থগুলো হচ্ছে (১) বাঙ্গালা প্রাচীন পুঁথির বিবরণ, ১ম ও ২য় সংখ্যা (পরিষৎ পত্রিকা ) ১৯১৩, (২) বাঙ্গালা প্রাচীন পুঁথির বিবরণ ১ম খণ্ড ১ম সংখ্যা  (গ্রন্থাকারে ১৯১৪), (৩) পুঁথি পরিচিতি  (আহমদ শরীফ সম্পাদিত) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত, (Descriptive Catalogue of Bengali Manuscripts) নামে সৈয়দ সাজ্জাদ হোসাইন অনূদিত এবং এশিয়াটিক সোসাইটি অব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে ১৯৬০ সালে প্রকাশিত, (৪) প্রাচীন পুঁথির বিবরণ (হিন্দু রচিত পুঁথির বিবরণ, রাজশাহী বরেন্দ্র মিউজিয়াম কর্তৃক প্রকাশিতব্য), (৫) ইসলামাবাদ  (চট্টগ্রামের সচিত্র ইতিহাস, ১৩২৫-২৭ সনে সওগাত পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত) সৈয়দ মুর্তাজা আলী সম্পাদিত এবং বাংলা একাডেমী থেকে ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত, (৬) আরাকান রাজসভায় বাঙ্গালা সাহিত্য [মুহম্মদ এনামুল হকের সহযোগে রচিত] ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে কলিকাতা থেকে প্রকাশিত।


আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ সম্পাদিত আরো কিছু পুঁথি রয়েছে। যেমন, মুসলমান বৈষ্ণব কবি (১৯০৪), রাধিকার মানভঙ্গ (১৯০৫), নারায়ণদেবের পাঁচালী (১৯০৬), লক্ষ্মীচন্দ্র পাঁচালী (১৩১৭ বঙ্গাব্দ), কালকেতুর চৌতিশা, গঙ্গামঙ্গল (১৯১৬) তা ছাড়া মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে তার প্রায় ছয়শত মৌলিক গবেষণামূলক প্রবন্ধ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।


আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ ছিলেন মূলত পুঁথি সংগ্রাহক। মুহম্মদ আবদুল হাই তার সম্পর্কে বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত গ্রন্থে বলেছেনÑ“পুঁথি সংগ্রহ তাঁকে নেশার মত পেয়ে বসেছিল। নানা জায়গায় বিপ্তি পুঁথিগুলো অযতেœ ও অবহেলায় সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেলে বাংলার প্রাচীন সাহিত্যের একমাত্র নির্ভরযোগ্য উপাদান নিঃশেষিত হয়ে যাবে, সেই সঙ্গে মধ্যযুগের বাঙালী মুসলমানদের সাহিত্যের স্বরূপও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, সম্ভবত এ চিন্তাই জাতি-প্রাণ আবদুল করিমকে পুঁথি সংগ্রহে অনুপ্রাণিত করেছিল। কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকার পুঁথি সংগ্রহের কাজে আবদুল করিমকে এক কপর্দকও সাহায্য করেননি, তবু এ অপরাজেয় বৃদ্ধ নিজের অর্থে নিজের পরিশ্রমে আড়াই হাজারের অধিক পুঁথি সংগ্রহ করে গেছেন। এগুলোর মধ্যে এক হাজারেরও বেশি পুঁথি বাংলার মুসলমানদের দ্বারা রচিত। প্রাচীন বাংলার মুসলমানদের বাংলা সাহিত্য-সাধনার প্রত্য উদাহরণস্বরূপ এত বড় সংগ্রহ আজ পর্যন্ত অন্য কোনো লোক বা শিা প্রতিষ্ঠানের দ্বারা সম্ভব হয়নি। আবদুল  করিমের জীবনের এই-ই এক অমর কীর্তি।”


বর্তমানে পুঁথি সাহিত্য ও মধ্যযুগের সাহিত্য সম্পর্কে বাঙালি মুসলমানের আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে, গবেষণাও বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সবই আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের পুঁথি সংগ্রহের কারণে সম্ভব হয়েছে।


সাহিত্যবিশারদ রচিত প্রাচীন পুঁথির বিবরণের ভূমিকায় ব্যোমকেশ মুস্তফী লিখেছেন, “পুঁথি অনুসন্ধান করিতে গ্রামে গ্রামে ঘুরিয়া বেড়াইবার অবসর ও ব্যয় নির্বাহের মত আর্থিক সচ্ছলতা তাঁহার নাই, মূল্য দিয়া তিনি পুঁথি ক্রয় করিতে পারেন, এমন অর্থ তাহার নাই-ই, তথাপি কেবল মাতৃভাষার প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা, প্রীতি ও ভক্তিবশত তিনি জীবনের দীর্ঘকাল এই পুঁথি সংগ্রহে যথাসাধ্য ব্যয় করিয়াছেন। …


তিনি মুসলমান, কোন হিন্দুর আঙ্গিনায় তাঁহার প্রবেশাধিকার নাই, কিন্তু হিন্দুর ঘরে পুঁথি আছে শুনিয়া তিনি ভিখারীর মত তাহার দ্বারে গিয়া পুঁথি দেখিতে চাহিয়াছেন। পুঁথি সরস্বতী পূজার দিন পূজিত হয়। অতএব মুসলমানকে ছুঁইতে দেওয়া হইবে না বলিয়া অনেকে তাঁহাকে দেখিতেও দেন নাই। অনেকে আবার তাহার কাকুতি মিনতিতে নরম হইয়া নিজে পুঁথি  খুলিয়া পাতা উল্টাইয়া দেখাইয়াছেন, মুন্সী সাহেব দ্বারের বাহিরে দাঁড়াইয়া হস্তস্পর্শ না করিয়া কেবল চোখে দেখিয়া নোট করিয়া সেই সকল পুঁথির বিবরণ লিখিয়া আনিয়াছেন। এত অধ্যবসায়, এত আগ্রহে, এমন করিয়া কোন হিন্দু অন্ততঃ তাঁহার নিজের ঘরের পুঁথিগুলির বিবরণ লিখিতে বা অন্য কোন কার্যে হাত দিয়াছেন কিনা, জানি না। মুন্সী সাহেবের নিকট বাংলা সাহিত্য সমাজের কৃতজ্ঞতার পরিমাণ যে কত বেশী, তাহা ইহা হইতেই অনুমান করা যায়।”


আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ সম্পর্কে অনেক পণ্ডিত মূল্যবান বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক মনের অধিকারী। তার লেখা থেকেই তার অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন, তিনি লিখেছেন, “হিন্দু ও মুসলমানের ধর্ম, আদর্শ ও ঐতিহ্য ভিন্ন হইতে পারে। তাহাদের সৃষ্ট সাহিত্য ও স্ব স্ব ধর্ম, আদর্শ ও ঐতিহ্য অনুরূপ হইতে পারে, কিন্তু পদ্ম, যুঁই, শেফালিকার পার্শ্বে গুলাব, নার্গিস, হাস্নাহেনার বাগান গড়িয়া উঠিলে শোভা দ্বিগুণ বর্ধিত হইবে বই কমিবে না। কোকিল ও বুলবুলের পরস্পর জানাজানির মধ্যে মিলনের সুর পাওয়া যাইবে, হিন্দু ও মুসলমানের ভাবের মিলনের মধ্যে এক মহাবাণী ফুটিয়া উঠিবে। হিন্দু মুসলমান ও পাশ্চাত্য ভাবধারা মিলিয়া বঙ্গ সাহিত্যে ভাবের ত্রিবেণী-সঙ্গম সৃষ্ট হইবে।’ (বঙ্গ সাহিত্য পরিক্রমা)


মূলত আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের মতো নিষ্ঠাবান পুঁথি সংগ্রহকারী বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে আর একজনও নেই। আবদুল করিমের এই নিরলস সাহিত্য-সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ চট্টগ্রামের পণ্ডিতসমাজ তাকে ‘সাহিত্যবিশারদ’এবং নদীয়ার পণ্ডিতসমাজ  তাকে ‘সাহিত্যসাগর’উপাধি দিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যের এই অতুলনীয় সাহিত্যকর্মী ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ সেপ্টেম্বর নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন।

 
-ড. আব্দুর রহিম