Sunday, 12.17.2017, 11:26pm (GMT+6)
  Home
  FAQ
  RSS
  Links
  Site Map
  Contact
 
আবদুুল হাই মাশরেকী ছিলেন মূলসংস্কৃতির শিকড়ের আধুনিক কবি ; লোককবি আবদুুল হাই মাশরেকীর ৯৭তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে শিল্পকলায় দুদিনব্যা ; লোককবি আবদুুল হাই মাশরেকীর ৯৭ তম জন্মজয়ন্তী আগামী ১ এপ্রিল ২০১৬ ; আল মুজাহিদী ; ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন
::| Keyword:       [Advance Search]
 
All News  
  গুণীজন সংবাদ
  বিপ্লবী
  ভাষা সৈনিক
  মুক্তিযোদ্ধা
  রাজনীতিবিদ
  কবি
  নাট্যকার
  লেখক
  ব্যাংকার
  ডাক্তার
  সংসদ সদস্য
  শিক্ষাবিদ
  আইনজীবি
  অর্থনীতিবিদ
  খেলোয়াড়
  গবেষক
  গণমাধ্যম
  সংগঠক
  অভিনেতা
  সঙ্গীত
  চিত্রশিল্পি
  কার্টুনিস্ট
  সাহিত্যকুঞ্জ
  ফটো গ্যাল্যারি
  কবিয়াল
  গুণীজন বচন
  তথ্য কর্ণার
  গুণীজন ফিড
  ফিউচার লিডার্স
  ::| Newsletter
Your Name:
Your Email:
 
 
 
ব্যাংকার
 
লুৎফর রহমান সরকার




লুৎফর রহমান সরকার, বাংলাদেশের ব্যাংকিং জগতে এক আলোকজ্যোতির নাম। সততায়, দক্ষতায়, উদ্ভাবনী সৃজনশীলতায় সকলের কাছে তিনি শুধু শ্রদ্ধাভাজন এক ব্যক্তি নন, আদর্শস্থানীয় সফল এক প্রতিষ্ঠানের নাম।

রাজনৈতিক চাপে, ঋণখেলাপিদের দাপটে, অনৈতিকতার শক্তিতে বাংলাদেশের শিল্প সাম্রাজ্যের রথী-মহারথীরা অনেক ওলটপালট করতে সমর্থ হয়েছেন কিন্তু থেমে গেছেন লুৎফর রহমান সরকারের নৈতিকতার সামনে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর থাকাকালীন দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের কেউ কেউ তাকে ধমকে কাজ আদায় করতে গেছেন, কিন্তু অনমনীয় লুৎফর রহমান সরকার সততা আর নৈতিকতার জোরে তাদের বিফল করেছেন। উল্টো ঋণখেলাপিদের তালিকা সংবাদপত্রে ছেপে গোটা জাতির সামনে তাদের প্রকৃত চেহারা উন্মোচন করেছেন।

একসময় উদ্ভাবনী ‘বিকল্প’ প্রকল্প চালু করে তিনি গোটা দেশে আলোড়ন ফেলেছেন। আবার এই প্রকল্পকে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহৃত হতে দেননি বলে খোদ রাষ্ট্রপ্রধানের বিরাগভাজন হয়েছেন। তারই ফলশ্রুতিতে দুর্নীতির অভিযোগে তাকে হাজির হতে হয়েছে সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচারের সামনে । কিন্তু সেখানেও অনড়, দৃঢ় তিনি। তাকে টলাতে পারেনি স্বৈরাচারের সামরিক ট্রাইব্যুনাল।

বরং নিজের অভিযোগের বিরুদ্ধে এক সৎভাষণ লিখে, জ্যোতির্ময় এক ‘জবানবন্দী’ পড়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন খোদ সামরিক ট্রাইব্যুনালকেই।

এই বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময় আদর্শবাদী কর্মবীর, স্বপ্নদ্রষ্টা ব্যাংকার, সফল মানুষ, যিনি নতুন প্রজন্মের শক্তিতে ভর করে সম্ভাবনাময় বাংলাদেশকে দেখেন প্রতিনিয়ত, সেই তাঁকে নিয়ে লিখেছেন শুভ কিবরিয়া

১৯৮৪ সালের মার্চ মাস। সামরিক আদালতে তখন চলছে তার বিচার । স্বৈরশাসকের অন্যায় আবদার, অন্যায্য দাবির প্রতি নতিস্বীকার করেননি বলেই দুর্নীতির দায়ে তিনি বিচারাধীন। কিন্তু তিনি জানেন, তিনি নির্দোষ। কোনো দুর্নীতি করেননি। সারা কর্মজীবনে দেশ, জাতি, সমাজের অমঙ্গলের কোনো চিন্তা কখনই করেননি। পেশাদারি জীবনে সততা বজায় রেখেছেন হিমালয়সম দৃঢ়তায়। তাকে যারা চেনেন, তারা জানেন তার দ্বারা দুর্নীতি করা কখনই সম্ভব নয়। কিন্তু সামরিক স্বৈরশাসক বলে কথা! তাকে অগ্রাহ্য করার শাস্তি তো পেতেই হবে!!

কিন্তু পরাভব মানা তো যাবে না। বর্ণাঢ্য পেশাদারি জীবনে কখনই পরাভব মানেননি। আজও মানবেন না। উঠে দাঁড়ালেন এই ভাবনা মাথায় নিয়েই। সামরিক আদালতের পোশাকি বিচারকদের দিকে একবার তাকালেন। তারপর পড়া শুরু করলেন নিজের হাতে লেখা ‘জবানবন্দী’।

২.
তিনি জানেন সামরিক আদালতে পৃথিবীতে কখনও কোনো সুবিচার হয়নি। তার নিজেরও হবে না। কিন্তু চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের কাছে বিবেক, নৈতিকতা তো বিসর্জন দেয়া সম্ভব নয়।

তাই সত্যকথন উচ্চারণ করতেই হবে। আজ হোক কাল হোক সমস্ত অন্ধকার ভেদ করে সত্য তো মানুষ জানবেই।
কেননা, পৃথিবীর তাবৎ অনাচারী, বিনষ্ট মানুষের অন্যায্য আচরণ তো ইতিহাসের বিচারেই ঘৃণিত হয়েছে। এই শাশ্বত সত্যে ভরসা করে তিনি উচ্চারণ করলেন, ‘মহামান্য আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে আজ আমি দৃঢ়কণ্ঠে বলতে পারি, এ আদালতের বিচারে আমার কি হবে জানিনে, তবে সময়ের বিচারে আমি অবশ্যই জয়ী হব। সে ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। কারণ আমি জানি ন্যায় ও সত্যের পথে আছি এবং আমি যা করেছি তা দেশের বৃহত্তর কল্যাণ ও ব্যাংকের মঙ্গলকে সামনে রেখেই করেছি। আজ হোক কাল হোক সত্য ও ন্যায়ের জয় হবেই। মঙ্গল ও কল্যাণেরই জয় হবে- এ আমার গভীর অনুভূতি, দৃঢ় প্রত্যয় এবং আন্তরিক বিশ্বাস।’

নতজানু বুদ্ধিজীবীতা আর ক্ষমতার হালুয়ারুটির স্বাদে বিনষ্ট বামন পরজীবীদের এই কালে এমন সত্য উচ্চারণ করে যিনি স্বমহিমায় উজ্জ্বল থেকে এখনও সবার সম্মান, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা কেড়েছেন, তিনি সফল ব্যাংকার, আদর্শ মানুষ লুৎফর রহমান সরকার। আমাদের আদর্শহীনতার অন্ধকার সময়ের এক আলোকপুরুষ। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তার একটি বই তাঁকে উৎসর্গ করে লিখেছেন,

লুৎফর রহমান সরকার

‘এই অন্ধকার সময়ে সততা ও

মূল্যবোধের অন্যতম প্রদীপ ॥’

৩.
তাঁর বিরুদ্ধে সামরিক আদালতে আনা সকল অভিযোগ যে ভিত্তিহীন, অসত্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, আদালতে দাঁড়িয়ে তা তিনি সুউচ্চ কণ্ঠে দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন।

এ অভিযোগ যে শুধু অগ্রহণযোগ্য তাই-ই নয়, এ অভিযোগের সঙ্গে তার সহকর্মীদের যেভাবে জড়ানো হয়েছে তাও অন্যায্য। কেননা, দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে সকল দায় তার নিজের। তাই তিনি সামরিক আদালতে দাঁড়িয়ে নির্দ্বিধায় বলেছেন, ‘এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ দায়-দায়িত্ব আমার নিজের। আমার সহকর্মীদের যাদের এ মামলায় অহেতুক জড়িত করা হয়েছে তাদের কোনো দোষ বা দায়-দায়িত্ব নেই। একইভাবে আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোও অমূলক ও ভিত্তিহীন। আমি দৃঢ়কণ্ঠে বলতে পারি, আমি কোথাও কোনো অনিয়ম করিনি বা শৃঙ্খলা ভঙ্গ করিনি। যা কিছুই করেছি স¤পূর্ণ সদিচ্ছা নিয়েই করেছি এবং স¤পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিকভাবেই করেছি। ব্যাংকের ক্ষতি হয় বা দেশের ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজ করা তো দূরের কথা, চিন্তার মধ্যেও কোনোদিন স্থান দেইনি। সারা জীবন ধরে শুধু মঙ্গল কামনা করেছি। মঙ্গলের জন্য সাধনা করেছি। মঙ্গলের জন্যই একাগ্রচিত্তে কাজ করছি। এর এতটুকুন ব্যতিক্রম কোথাও আজও হতে দেইনি।’





সামরিক আদালতে দাঁড়িয়ে সেই সত্যভাষণের পুরস্কার মিলেছিল , কারাদণ্ড। জননন্দিত, বহুল প্রশংসিত, উদ্ভাবনী, আশাজাগানিয়া, সৃজনশীল ‘বিকল্প’ প্রকল্পের জনক সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক লুৎফর রহমান সরকার ও তার সহকর্মীরা সামরিক আদালতের বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারে কারাদণ্ড পান। কিন্তু জনতার আদালত তা মেনে নেয়নি। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা এরশাদের সেই স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে, প্রতিবাদে, আন্দোলনে রাস্তায় নামে। লুৎফর রহমান সরকারÑ সেই আদর্শ মানুষ, সেই ব্যাংকার যার মুক্তির দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এ ঘটনা নজিরবিহীন। জনতার আদালতের রায়ে পরাভূত স্বৈরশাসক বাধ্য হন লুৎফর রহমান সরকারকে মুক্তি দিতে। ৮১ দিন কারাভোগের পর মুক্ত হন তিনি।

৪.
সামরিক আদালতে দাঁড়িয়ে যে সত্যকথন উচ্চারণ করেছিলেন লুৎফর রহমান সরকার, দ্রুতই তা সত্যে পরিণত হয়। ১৯৯৬ সালে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিযুক্তি পান তিনি। সামরিক আদালতে দণ্ডিত লুৎফর রহমান সরকার গণতান্ত্রিক আমলে ব্যাংকিং সেক্টরের সর্বোচ্চ পদে আসীন হন।

তিনিই বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসের প্রথম গভর্নর যিনি ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনানুগভাবে সোচ্চার ও সক্রিয় হন। ঋণখেলাপির তালিকা সংবাদপত্রে প্রকাশ করে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেন। ঋণখেলাপি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সে সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের এই সাহসী ও ন্যায়ানুগ পদক্ষেপ বিচলিত করে ক্ষমতাবান ঋণখেলাপিদের অনেককেই। তার চেম্বারে ঢুকে তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে দেশের তখনকার শীর্ষ ঋণখেলাপিদের অন্যতম ভ্রাতৃদ্বয়। কিন্তু লুৎফর রহমান সরকার অবিচল থাকেন তার সিদ্ধান্তে। ঋণখেলাপিদের এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রকাশ করে জনমত এসে দাঁড়ায় তারই পাশে।

৫.
১৯৫৬ সালে রেডিও পাকিস্তানের ব্রডকাস্টিং হাউজে মনিটরিং বিভাগে অ্যানালিস্ট হিসেবে যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও পরের বছরেই লুৎফর রহমান সরকার যোগ দেন ব্যাংকে।

১৯৫৭ সালে করাচির তৎকালীন হাবিব ব্যাংকে অফিসার হিসেবে যোগ দিয়ে ব্যাংকে তার কর্মজীবন শুরু। এরপর পরিশ্রম, সততা আর নিজ যোগ্যতায় ধাপে ধাপে উঠে এসেছেন বিভিন্ন ব্যাংকের উচ্চতর নানা পদে। তদানিন্তন পাকিস্তানের স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, রূপালী ব্যাংকে ডিজিএম, অগ্রণী ব্যাংকের জিএম এবং ১৯৮৩ সালে একই ব্যাংকের এমডি হন তিনি। এই বছরেই সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে যোগদান করেন।

কারাভোগের পর কিছুদিন কর্মহীন কাটিয়ে তিনি যোগ দেন প্রথমে ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডে চিফ অ্যাডভাইজার হিসেবে, এরপর প্রাইম ব্যাংক লিঃ-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে। দুটো ব্যাংককে শক্ত অবস্থানে দাঁড় করিয়েছেন লুৎফর রহমান সরকার তার মেধা, প্রজ্ঞা, পরিকল্পনা আর কর্মকুশলতা দিয়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে চুক্তি শেষে দায়িত্ব নিয়েছিলেন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের চিফ অ্যাডভাইজার হিসেবে। ২ জুন ১৯৯৯ থেকে ১৪ এপ্রিল ২০০৫ পর্যন্ত সেই দায়িত্ব পালন করেছেন সম্মানের সঙ্গে। অত্যন্ত শক্ত খুঁটির ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন বেসরকারি এই ব্যাংকটিকেও।

৬.
ব্যাংকিং পেশাগত জীবনের সর্বত্রই তিনি স্বল্প আয়ের মানুষের কল্যাণের জন্য বিভিন্নভাবে সচেষ্ট থেকেছেন। উদ্যমী মেধাবী তরুণদের কথা ভেবেছেন। সোনালী ব্যাংকে তাই তিনি চালু করেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্মসংস্থান প্রকল্প ‘বিকল্প’ নামের এক যুগভেদী কর্মসূচির।

ক্রমেই শিক্ষিত যুবকদের আত্মকর্মসংস্থানমূলক ‘বিকল্প’ এতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, গোটা দেশের বেকার শিক্ষিত যুবকরা দলে দলে এই প্রকল্পের আওতায় সদস্য হতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই প্রকল্পের জনপ্রিয়তা তৎকালীন স্বৈরশাসককে তার রাজনৈতিক কাজে এই ব্যাংককে ব্যবহারের জন্য প্রলুব্ধ করে তোলে। এর মাধ্যমে তার ছাত্র সংগঠন তৈরির মতলব তাকে এতটাই অস্থির করে যে, তিনি খোদ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককেই এ বিষয়ে নির্দেশনা দিতে থাকেন। কিন্তু তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক লুৎফর রহমান সরকার অন্য ধাতুতে গড়া মানুষ। এঁরা অনৈতিকতার কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে শেখেননি। তাই স্বৈরশাসকের অনৈতিক ক্ষমতা পরাভূত হয় তাঁর অনমনীয় নৈতিক দৃঢ়তার কাছে। দেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও সেনাশাসক একজন ব্যাংক কর্মকর্তার এই আপসহীন মনোভাবকে ক্ষমা করেননি। তাকে অন্যত্র বদলি করে দুর্নীতির অভিযোগ এনে সামরিক আদালতে বিচার করে শাস্তি নিশ্চিত করেন।

৭.
স্বাধীন বাংলাদেশে দেশীয় ব্যাংকগুলোতে আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রবর্তন ঘটে ব্যাংকার লুৎফর রহমান সরকারের হাতেই। প্রায় পাঁচ দশকের ব্যাংকিং পেশায় তিনি বিভিন্ন ব্যাংকে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকিং খাতে নানা রকম উদ্ভাবনী ধারণার প্রবর্তন করেছেন। কেউ কেউ তাকে বাংলাদেশের গণমুখী ব্যাংকিংয়ের পথিকৃৎ বলে অভিহিত করেন। সীমিত আয়ের মানুষের সঞ্চয়ের কথা বিবেচনায় এনে তিনিই প্রথম ব্যাংকিং প্রোডাক্ট হিসেবে মাসিক সঞ্চয় প্রকল্প, মাসিক মুনাফা প্রকল্প, দ্বিগুণ বৃদ্ধি আমানত প্রকল্প সার্থকভাবে চালু করেন। দেশীয় ব্যাংকগুলোতে ডিপোজিট পেনশন স্কিম, আজীবন পেনশন স্কিম, কনজুমার ক্রেডিট, হোম লোন, লিজ ফাইন্যান্স, হায়ার পারজেস, ক্যাপিটাল মার্কেট অপারেশন, নারী উদ্যোক্তা ঋণ চালু করেন । দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে এসব নব নব আধুনিক আইডিয়ার প্রবর্তক তিনিই।

বাংলাদেশের সমাজ, আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা, জনমানস, সংস্কৃতি বিবেচনায় নিয়ে নৈতিকতা ও সততা বজায় রেখে ব্যাংকিং সেক্টরে আধুনিক এসব ধারণা তাকে এক সুউচ্চ আসনে নিয়ে যায়। এসব উদ্যোগ এখনও সমান জনপ্রিয়। বাংলাদেশের ব্যাংক পাড়ায় লুৎফর রহমান সরকার তাই এক প্রাতঃস্মরণীয় নাম।

শুধু তাই নয়, ব্যাংকিং শিক্ষা জগতে উন্নততর মানবসম্পদ তৈরির চিন্তা থেকেই বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অগ্রণীদের অন্যতম। তারই নেতৃত্বে গঠিত হয় পেশাদার ব্যাংকারদের সংগঠন ‘ব্যাংকার্স ক্লাব’ যা এখন ‘এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স’ নামে পরিচিত।

৮.
ব্যাংকিং পেশায় তিনি সবসময় জোর দিয়েছেন সৃজনশীল সম্ভাবনায় উদ্যোগের প্রতি, উদ্যোক্তাদের প্রতি। দেশের নতুন নতুন খাতে, নতুন নতুন উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে, চিন্তার দৃঢ়তা দেখে কিংবা উদ্যম দেখে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ঝুঁকি নিয়ে ঋণ দিয়েছেন। মেডিক্যাল ডায়াগনস্টিক সেক্টরে, সিল্ক ইন্ডাস্ট্রিতে, স্থাপত্যকলাসহ নানা নতুন সেক্টরে দেশের প্রথিতযশা উদ্যোক্তাদের অনেকেই প্রথমাবস্থায় কোনো ব্যাংকে সহায়তা পাননি। হতাশ হয়েছেন। লুৎফর রহমান সরকার তাদের ব্যাংকিং সহায়তা দিয়েছেন। সেই ব্যাংকিং সহায়তার হাত ধরেই তারা আজ নিজ নিজ আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। এই দূরদৃষ্টি, এই প্রত্যয় ছিল তার সারা কর্মজীবনজুড়ে।

৯.
লুৎফর রহমান সরকার তরুণদের নিয়ে বাস্তবে কাজ করেছেন, দেখেছেন তাদের শক্তিমত্তা। তরুণদের নিয়ে তিনি সবসময়ই খুব আশাবাদী থেকেছেন। তার ধারণা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিহিত আছে নতুন প্রজন্মের মধ্যে। পরিশ্রম, সততা আর মূল্যবোধের ছোঁয়া পেলে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ বদলে দেবে দেশের চেহারা। তাই তরুণদের বিষয়ে সারা জীবন জুড়ে থেকেছেন তিনি ভীষণভাবে উৎসাহী। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মতো সৃজনশীল প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছেন নিজেকে। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের অনুরোধে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি বোর্ডের একজন সদস্য হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা রেখে চলেছেন এখনো ।

নিজে অসম্ভব ব্যস্ত জীবন পার করেছেন। কিন্তু ভোলেননি, নৈতিক মূল্যবোধ থেকে সরে গেলে তরুণ সমাজের বিপর্যয় ঘটবে। দেশকে তারা ঠেলে দেবে ভয়াবহ সঙ্কটের দিকে। তাই তাদের অনুপ্রেরণা দেবার জন্য সংকলিত করেছেন, ‘হাদীসের বাণী’, ‘বরণীয় জনের স্মরণীয় বাণী’ নামের দুটি প্রেরণামূলক বই।

‘হাদীসের বাণী’ বইটির ভূমিকাতে লুৎফর রহমান সরকার লিখেছেন, ‘হাদীসের বাণী সংকলন করার কোনো যোগ্যতাই আমার নেই। তবু কেন এ কাজে হাত দিলাম? বর্তমানে তরুণ সমাজ যে হারে নৈতিক মূল্যবোধ থেকে দ্রুত সরে যাচ্ছে, তাতে দেশে একটা বিরাট মূল্যবোধের সঙ্কট সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাই তাদের নৈতিকতা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য আমাদের প্রজন্মের অনেক দায়িত্ব রয়েছে বলে আমি মনে করি। এই দায়িত্ব পালনের জন্যই মূলত এ ক্ষুদ্র সংকলেনে হাত দেয়া।’

শুধু প্রেরণামূলক বই-ই নয়, ছড়ার বই, রম্যরচনা লিখে তিনি তরুণদের আনন্দ দিতে চেয়েছেন। তাদের আলোকিত মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠার পথকে আনন্দময় করতে চেয়েছেন।

১০.
লুৎফর রহমান সরকার চিরকাল শিল্প, বাণিজ্য- সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। সারা কর্মজীবনে যখনই সুযোগ পেয়েছেন নামি, অনামি, চেনা-অচেনা শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে উৎসাহ জুগিয়েছেন। এ বিষয়ে তার নিজের অভিব্যক্তি, ‘আমার চাকরি জীবনে আমি আমার সাধ্যমতো সবসময় শিল্প, সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করার চেষ্টা করেছি। এ ব্যাপারে কাউকে ফিরিয়ে দিয়েছি মনে পড়ে না।’

বই তার খুব প্রিয়। বইয়ের মধ্যেই পেয়েছেন জীবনের এক অমিত শক্তি। নিজের সংগ্রহে আছে অসংখ্য বই। সমৃদ্ধ পারিবারিক লাইব্রেরি গোটা পরিবারের জন্যই এক অফুরন্ত আনন্দের উৎস। সামরিক আদালতে জেলদণ্ড ঘোষণার পরপরই মেয়েদের ডেকে বলেছিলেন, ‘আমার পড়ার ঘরে টেবিলের ওপর কিছু বই রেখে এসেছি। বইগুলো পাঠিয়ে দিও’।

১১.
লুৎফর রহমান সরকার চিন্তায় চেতনায় মুক্তমনের এক আধুনিক মানুষের নাম। ছেলেমেয়েদের বন্ধুত্ব, সম্পর্ককে তিনি দেখেছেন সবসময় অসম্ভব সমীহসহকারে। নিজের সন্তানদের যেমন স্বাধীনতা দিয়েছেন সঙ্গী নির্বাচনে, তেমনি আত্মীয়, পরিজন, বন্ধু-স্বজন সকলের পরামর্শক, নির্ভরতার প্রতীক হয়ে থেকেছেন সকল সময় সকল বিষয়ে। কারও ছেলেমেয়ে রাজি, অভিভাবক বাধ সেধেছে এমন অনেক ঘটনায় তার বলিষ্ঠ ভূমিকায় অবশেষে সফল হবার চমদপ্রদ অনেক উদাহরণ রয়েছে তাঁর পরিবার পরিজনদের কাছে। শুধু নিজের পরিবারের মধ্যে নয়, পরিবারের বাইরে অনেকের জীবন সাথীদের মিলনযোগে রেখেছেন এক অসাধারণ মানবিক অভিভাবকের ভূমিকা। ছেলে বা মেয়ে নয়, সবাইকে দেখেছেন মর্যাদাশীল মানুষ হিসেবে। চেয়েছেন মর্যাদায়, যোগ্যতায় মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠুক সবাই।

ভীষণ শিক্ষানুরাগী মানুষ তিনি। পড়াশোনার বিষয়ে যে কাউকে সাহায্য করার ব্যাপারে সবসময়ই ছিলেন ভীষণ অকৃপণ, উদার। কিন্তু তদবির করে কাউকে চাকরির সুযোগ দেয়ার মতো অনৈতিকতা কখনোই পেয়ে বসেনি তাকে। তিনি দু’দুটি সরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। দু’দুটি বেসরকারি ব্যাংকের গোড়াপত্তন হয়েছে তার হাতে। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হয়েছেন। কিন্তু কখনোই কাউকে তদবিরের মাধ্যমে চাকরি দেয়ার ব্যাপারে আগ্রহী হননি। আত্মীয়স্বজনরা প্রত্যাশা করেছে কিন্তু কারও চাকরির বিষয়ে কখনোই আত্মীয়করণের সুযোগ নেননি। তদবির করেননি। কখনোই নিজ অবস্থান থেকে নড়েননি। সততায়, দৃঢ়তায় নিজের আদর্শে অনড় থেকেছেন।

১২.
তার জীবনাদর্শের একটা পরিচয় পাওয়া যায় জেলখানা থেকে স্বজনদের কাছে লেখা চিঠির এই অংশে, ‘জীবন সরল রেখায় চলে না। জীবন পিচঢালা পথ নয়। জীবন চলে নদীর মতো এঁকেবেঁকে। জীবনে চড়াই-উৎরাই আছে, উত্থানপতন আছে। জীবনে সুখ যেমন আছে দুঃখও তেমনি আছে। এ জন্যই জীবন বিচিত্রময় আনন্দময়। শুধুই আনন্দ শুধুই সুখ, জীবনে অকল্পনীয় ব্যাপার। তাই সুখে যেমন আত্মহারা হতে নেই, তেমনি দুঃখেও ধৈর্যহারা হতে নেই।’

স্বার্থপরতা নয় পরার্থপরতাই তার কাছে জীবনের এক মহাআনন্দের নাম। সামরিক আদালতের বিচারে কারাগারে থেকেও তিনি ভোলেননি সে কথা। ১৩ মে ১৯৮৬, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে থেকে মেয়েকে এক চিঠিতে তিনি লিখেছেন : ‘নিজে কি পেলাম সেটা বড় কথা নয়, নিজে কি দিলাম সেটাই বড় কথা। ভোগে আনন্দ নেই, ত্যাগেই আনন্দ। এ ত্যাগের আনন্দই আমি কামনা করেছি সারা জীবন। সেই আনন্দ থেকে এখন আমি বঞ্চিত। অন্যের কিছু কাজে লাগার আনন্দ থেকে বঞ্চিত। এটাই আমার দুঃখ।’

১৩.
তিনি জীবনের সকল সঙ্কটে অবিচল থেকেছেন, ধৈর্যহারা হননি। শান্তভাবে সঙ্কট মোকাবিলার চেষ্টা করেছেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ভয়াবহ দুর্যোগের সেই দিনে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রায় দু’মাস নিখোঁজ ছিলেন। তারপর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপিত হলে বগুড়া থেকে পুরো পরিবারকে ঢাকায় এনে নিজের সঙ্গে রেখেছেন। রেডক্রসের আওতাধীন ঢাকার পূর্বাণী হোটেলে থাকার সময় সেই বিশেষ সুযোগ ব্যবহার করে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেছেন নানা উপায়ে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই দুর্দিনে স্বজন হারিয়েছেন। নিজের অত্যন্ত প্রিয় শ্যালক, সন্তানসম, বগুড়ার কীর্তিমান মুক্তিযোদ্ধা খোকন শহীদ হয়েছেন। সে শোক কখনও ভোলেননি।

বাবা-মাকে অসম্ভব ভালোবেসেছেন তিনি। তাঁদের জন্য তাঁর উৎকণ্ঠার শেষ ছিল না। তাঁরা বেশির ভাগ গ্রামের বাড়িতে থাকলেও প্রায়ই তিনি তাদের নিজের কাছেই নিয়ে রাখতেন।

তাঁর মা মারা যান ঢাকার পিজি হাসপাতালে। পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করতে তার মৃতদেহ নিয়ে যেতে হবে বগুড়ায়। কিন্তু লাশ বহনের জন্য মাইক্রোবাস পাওয়া গেলেও ড্রাইভার পাওয়া গেল না। তখন তিনি নিজের গাড়ির ড্রাইভারকে মাইক্রোবাস চালাতে দিয়ে নিজে কার চালিয়ে ঢাকা থেকে বগুড়ায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দেন। বিপদের দিনে অবিচল, স্থিতধী থাকার এ ঘটনার স্মৃতি এখনো তার মেয়েদের কাছে বিস্ময়ের কারণ হয়ে রয়েছে।

১৪.
আপসহীন দৃঢ়তা তাকে সব সময় মেরুদণ্ড সোজা রেখে ন্যায় ও সত্যের পথে অবিচল রেখেছে। কখনো কোনো চাপ বা হুমকির কাছে নত হন নাই। সাময়িক আপস করেন নাই। তোয়াক্কা করেন নাই কোনো অন্যায় ক্ষমতার কাছে। যেটা মনে করেছেন ঠিক, সত্য- সে কাজেই এগিয়ে গেছেন। পেশাদারি জীবনে অনেক অন্যায় আবদার এসেছে, কিন্তু তিনি যেটা ভালো মনে করেছেন, ইস্পাতসম দৃঢ়তায় তাই করেছেন। কাউকে খুশি করার জন্য, তোষামোদ করার জন্য কখনও নিজের বিবেক বিবেচনাকে বিসর্জন দেননি।

দেশের প্রতি তার মমত্ব ও ভালোবাসা তাকে এ সত্যপথে চালিত করতে সহায়তা করেছে। তিনি সবসময় চেয়েছেন দেশের কাছে মানুষের যে ঋণ, তার বিপরীতে দেশকে সেবা দিতে। সকলকে উদ্বুদ্ধ করেছেন উচ্চ শিক্ষার জন্য দেশের বাইরে যেতে কিন্তু সবসময় বলেছেন, ফিরে এসে দেশকে সেবা দিতে হবে। নিজের পেশাগত জীবনে দেশের বাইরে অনেক ভালো সুযোগ এসেছে কখনই তা নেননি। দেশেই থেকেছেন। আত্মীয়পরিজন, চেনা মানুষ সবাইকে চূড়ান্তভাবে বিদেশে বসবাস করতে অনুৎসাহিত করেছেন। বলেছেন, চিরতরে বিদেশে স্থায়ী হলে দেশ তো তোমাদের সেবা থেকে বঞ্চিত হলো। এটা ঠিক না। মেধাবীদের সেবা না পেলে দেশের চেহারা বদলাবে কিভাবে। যতবার দেশের বাইরে গেছেন, মেধাবী প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে কথা হয়েছে, তাদের অনুরোধ করেছেন দেশকে তাদের সেবা দিতে।

১৫.
১৯৭৫ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেছেন। এ অভিজ্ঞতা তাকে দারুণ আনন্দ দিয়েছে। সবসময় তরুণদের প্রতি আশাবাদ, মমত্ব আর ভালোবাসা তার উপচে পড়েছে। ব্যাংকে যখনই সুযোগ পেয়েছেন ফ্রেশ, মেধাবী অভিজ্ঞতাহীন তরুণদের সুযোগ দিয়েছেন। অনেক বাধা এসেছে কিন্তু তিনি তোয়াক্কা করেননি। ভেবেছেন, মেধাবী তরুণদের সুযোগ না দিলে দেশকে তাদের সেবা দেবার সুযোগ কিভাবে মিলবে। পেশাদারি জীবনে এই বিবেচনা থেকেই সবসময় তরুণ উদ্যোক্তাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন। তরুণ, উদ্যমী, মেধাবী ছাত্রদের মধ্যেই তিনি উজ্জ্বল বাংলাদেশকে দেখতে পেয়েছেন। সেই দেখা তার এখনও অমলিন।

অবসর জীবনে শারীরিক অসুস্থতা তাকে কিছুটা কাবু করেছে কিন্তু বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রশ্নে তিনি দারুণ আশাবাদী। জিজ্ঞেস করতেই বলে উঠলেন, বাংলাদেশের ইয়াং জেনারেশন হচ্ছে, ‘হোপ ফর দ্যা ফিউচার’। যে নতুন প্রজন্ম আসছে তারাই বাংলাদেশের আসল চেহারা। আমাদের দেশে যে রকম ইয়াং ট্যালেন্ট আছে অন্য দেশে তা নেই। আমাদের নতুন প্রজন্ম পৃথিবীর যে কোনো দেশের চেয়ে কম মেধাবী নয়। আর বিদেশে যেসব প্রতিভাবান প্রবাসী বাংলাদেশিরা আছে, প্রয়োজনে, পরিবেশ পেলে এরাও এসে দেশকে তাদের সেবা দেবে।

জিজ্ঞেস করলাম, দেশে তো রাজনৈতিক অস্থিরতা চলেছে। এর মধ্যে আশাবাদ কই? হাসলেন, উজ্জ্বল হয়ে ওঠল তাঁর অবয়ব। অভিজ্ঞতায় পোড় খাওয়া লুৎফর রহমান সরকার বললেন, আজকে রাজনীতিবিদরা আগুন নিয়ে খেলছে। এটা সাময়িক। যে কোনো দেশেই প্রথমদিকে এ রকম কাদা ছোড়াছুড়ি হয়। বাংলাদেশে এখন তাই-ই চলছে। দেশের এখন যে চেহারা দেখছেন তা থাকবে না। সামনে আমাদের ভালো দিন আছে।

কারাগার থেকে মেয়েকে

কেন্দ্রীয় কারাগার
ঢাকা
১৩-৫-৮৬

মা সাকী,
তোমার চিঠি পড়ে আনন্দ পেলাম। তোমার পরীক্ষা খুব কাছে, দরজায় কড়া নাড়ছে। সময় নষ্ট মোটেই সমীচীন নয়। এই পরীক্ষার ভালো রেজাল্টের উপর তোমার জীবনের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা অনেকখানি নির্ভর করে। তবে আমি বলি না পরীক্ষা পাসই জীবনের সব। পড়াশোনা মানুষের জীবনকে সুন্দর করতে সাহায্য করে।

সে পড়াশোনা শুধু কলেজ-ভারসিটির পড়া নয়, সব রকম বই পড়া, সময় পেলেই পড়া। তবে ঐ যে বললাম জীবনের ভবিষ্যতে কর্মপন্থা ঠিক করার ব্যাপারে পরীক্ষায় ভালো ফল খুবই প্রয়োজন। তাই আমার বিশ্বাস, তুমি এ ব্যাপারে স¤পূর্ণ সজাগ। পড়াশোনার সাথে সাথে শরীরের প্রতি যত্ন নিও। শরীর ভালো না থাকলে মনও ভালো থাকে না, আর মন ভালো না থাকলে পড়াশোনার তো প্রশ্নই ওঠে না।

সময় সময় আমার মনে হয় কি জান? শরীরটা একটা প্রাইভেট কারের মতো। এর রং কি সেটা বড় কথা নয়। একে কত যত্ন করে পরিচর্যা করে পরিপাটি পরিচ্ছন্ন রাখতে পার। তারই ওপর নির্ভর করে এর স্থায়িত্ব ও চলার ক্ষমতা। আমাদের শরীরটাও আমাদের মনের বা আত্মার বাহন। গাড়ি যেমন আস্তে আস্তে বুড়ো হয়, তখন এর চলার ক্ষমতা রহিত হয় এবং একদিন তা পরিত্যক্ত হয়, শরীরও ঠিক তেমনি। আত্মা অবিনশ্বর কিন্তু আত্মার বাহন নশ্বর, ভঙ্গুর। তবে যথাযথ পরিচর্যা ও যত্ন নিলে শরীর নামক বাহনটিও বহুদিন সুন্দর ও সচল থাকে।

একটু দার্শনিকতা হয়ে গেল বোধ হয়। কথায় কথা আসে, তাই না বলে থাকতে পারলাম না।

গাছ দুটো বেশ সতেজ হয়ে উঠেছে। প্রত্যেকদিন যখন আমি নিজেই পানি দেয়ার জন্য পাত্র হাতে এগিয়ে যাই, তখন কাজের লোকেরা দৌড়ে এসে আমার হাত থেকে পাত্রটি কেড়ে নিয়ে তারাই পানি দেয়। বাগান এখনো ফুলে ফুলে ভরা। কত রংবেরঙের ফুলের সমারোহ। আজ সকাল বেলায় ছেলেমেয়ের কলকাকলিতে ঘুম ভেঙে গেল। উঠে দেখি ডেপুটি সুপারিন্টেনডেন্ট (ডিএস)-এর বাসার ওপর তলার জানালা থেকে ছেলেমেয়েরা ফুল নেয়ার জন্য চিল্লাচিল্লি করছে। দড়ি লাগিয়ে একটা পাত্র নিচে নামিয়ে দিয়েছে। বাগানে যাওয়া যারা সকাল সকাল ঘুরে বেড়াচ্ছিল তারা কিছু ফুল তুলে ছেলেমেয়েদের পাত্র ভরে দিচ্ছিল। ভালোই লাগছিল দৃশ্যটি। তাছাড়া ছেলেমেয়েদের আনন্দ উচ্ছলতা জীবনের তিক্ততাকে অনেকখানি দূর করে দেয়। মন উৎফুল্ল হয়ে ওঠে আনন্দে।

আমাদের এই নিউ জেলে আমাদের সঙ্গে যে স্কুল কলেজে ও ভারসিটির পাঁচ-ছয়জন ছেলে আছে, তারা বিকেল হলেই ঘুড়ি উড়ায়। বড়রাও তাতে যোগ দেয়। লম্বা সুতায় যখন তা দূর-আকাশে ওড়ে, দেখতে বড়ই ভালো লাগে। আশপাশের বসতি থেকেও অনেক ঘুড়ি আকাশে উড়ে। এক এক সময় সুতা কাটাকাটি শুরু হয়। কে কার ঘুড়িকে সুতা কেটে দিতে পারে। এ পর্যন্ত আমাদের ছেলেরা বেশ অনেকগুলো ঘুড়ি ঘায়েল করতে সক্ষম হয়েছে। অবশ্য একটা ঘুড়ি এদেরও গেছে।

তারপর ক্রিজ-বী/ ফ্লাইং সসার নিয়ে খেলা শুরু হয় বিকেল পাঁচটা থেকে। ছেলেরা খেলায় মেতে থাকে ঘণ্টা দেড়েক। বড্ড ভালো লাগে। বড়রা খেলে রিং। সবাই পর্যায়ক্রমে পনের/বিশ মিনিট করে খেলে। তারা খুব আনন্দ উপভোগ করে। সাথে সাথে ব্যায়ামেরও সুযোগ মেলে। এখানে বসে বসে শরীরে জং ধরার মতো হয়ে যায়। জেলে কিন্তু খাওয়া আর ঘুমানো ছাড়া আর বিশেষ কোনো কাজ থাকে না। কেউ কেউ অবশ্য তাস খেলে, কেরাম খেলে কিংবা বসে বসে গল্পগুজবে মেতে ওঠে। শারীরিক পরিশ্রম ছাড়া শরীর ঠিক রাখা যায় না। সকালে হাঁটাহাঁটি দৌড়াদৌড়ি অনেকেই করে। এখন এই খেলার সুযোগ তাদের জন্য খুবই ভালো হয়েছে।

তোমাদের ধারণা এখানে সবার শরীর খেয়ে না খেয়ে খারাপ হয়ে যায়। আমারও তাই ধারণা ছিল। কিন্তু আসল ব্যাপারটি মোটেই তা নয়। এখানে সময়মতো ও পরিমাণমতো খাওয়ার ব্যবস্থা থাকায় শরীর স্বাস্থ্য সবারই ভালো হয়। বাইরে থাকলে প্রতিদিনের যে ঝুট-ঝামেলা, সমস্যা সঙ্কট থাকে এখানে তার কোনো বালাই নেই। দিব্যি আরামে বসবাস বলতে পার। সমাজ-সংসার থেকে পৃথক- এই যা মানসিক শাস্তি। সমাজ সংসারে সমস্যা সঙ্কট যেমন আছে আনন্দও তেমনি আছে। সেই আনন্দ থেকে তারা বঞ্চিত।

জীবন সবল দেখায় চলে না। জীবন পিচঢালা পথ নয়। জীবন চলে নদীর মতো এঁকেবেঁকে। জীবনে চড়াই-উৎরাই আছে। উত্থান-পতন আছে। জীবনে সুখ যেমন আছে দুঃখও তেমনি আছে। এই জন্যই জীবন বৈচিত্র্যময়, আনন্দময়। শুধুই আনন্দ, শুধুই সুখ, জীবনে অকল্পনীয় ব্যাপার। তাই সুখে যেমন আত্মহারা হতে নেই, তেমনি দুঃখেও ধৈর্য হারা হতে নেই। তবে মনে হয় এ সময়টা বোধহয় উদ্দেশ্যবিহীনভাবে কেটে গেল। কারো কোনো কাজে লাগলাম না। কারো জন্য কিছু করার সুযোগ পেলাম না।

সমাজে আমরা সবাই স্বার্থপর। নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকি। তাই সমাজের এ করুণ অবস্থা। কিন্তু আমরা যদি সবাই সবার জন্য কাজ করতাম, তাহলে আমরা সবাই সুখে থাকতে পারতাম। একা সুখী হওয়া যায় না। সবাইকে নিয়ে সুখী হতে হয়। ‘আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ ধরনী পরে... সকলে আমরা সকলের তরে।’ - কবির এ কথা শাশ্বত সত্য। নিজে কি পেলাম সেটা বড় কথা নয়, নিজে কি দিলাম সেটাই বড় কথা। ভোগে আনন্দ নেই, ত্যাগেই আনন্দ। এই ত্যাগের আনন্দই আমি কামনা করেছি সারা জীবন। সেই আনন্দের থেকে এখন আমি বঞ্চিত। অন্যের কিছু কাজে লাগার আনন্দ থেকে বঞ্চিত। এটাই আমার দুঃখ। জানি নে আল্লার কি ইচ্ছা।

আমাকে নিয়ে তোমরা গর্ব অনুভব করোÑ এটাই তো আমার বড় পাওনা। তোমাদের এ গর্বই হোক আমার জীবনের বড় সঞ্চয়, আমার জীবনের সকল প্রেরণার উৎস।

তোমার আম্মার মতো মানুষ হয় না। মুখে যাই বলুক, অন্তর তার খুব ভালো। জীবনে যা কিছু হতে পেরেছি তার পেছনে তার অবদান কম না। সময় সময় মনে হয় তার মতো মানুষকে সাথী হিসেবে পেয়েছিলাম বলেই হয়ত জীবনে এতটুকু এগুতে পেরেছি। জীবনে মুখ ফুটে কোনোদিন কিছু চায়নি। জীবনে এক ভরি সোনার জিনিসও তাকে কোনোদিন দেইনি বা দিতে পারিনি। কিন্তু তাতে তাকে দুঃখ করতে দেখিনি কোনো দিন। এমন মেয়েমানুষও বর্তমান সমাজে আছে, কেউ বিশ্বাস করতে চাইবে না। তার কাছে শিখবার তোমাদের অনেক কিছুই আছে। তার পথ অনুসরণ করলে তোমরাও জীবনে সুখী হবে এ আমি দিব্যি করে বলে দিতে পারি।

আজ মে মাসের তেরো তারিখ। পুরো দু’মাস হলো। তোমাদের ছেড়ে থাকতে কি যে খারাপ লাগে বলে বুঝাতে পারব না। জীবনে তো কারো অমঙ্গল কামনা করিনি। বরং সবার মঙ্গলের জন্যই আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। ভালো কাজের ফল তো ভালোই হওয়ার কথা। তবে কেন আমার ক্ষেত্রে এমনটি হলো? সবাই বলে, এর মধ্যেও বড় মঙ্গল নিহিত আছে। জানিনে, এটা শুধুই সান্ত্বনার বাক্য কিনা? তবে সর্বস্তরের মানুষের যে ভালোবাসা পেয়েছি, তাতে মুগ্ধ না হয়ে পারিনি। সেটাই আমার বড় পাওনা। ধৈর্য ধরার জন্য তা আমাকে জুগিয়েছে অফুরন্ত প্রেরণা।

তোমাদের সবার জন্য রইল অনেক অনেক স্নেহ প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ এই পর্যন্তই।

ইতি-
তোমার আব্বা

সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি

১৯৩৪ : জন্ম ১ ফেব্রুয়ারি। ফুলকোট, বগুড়া।

পিতা- আলহাজ্ব দিরাজতুল্লাহ সরকার। মাতা- আসাতুন্নেসা।

১৯৫৫ : এমএ পাস। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

১৯৫৬ : অ্যানালিস্ট, মনিটরিং বিভাগ, ব্রডকাস্টিং হাউজ, রেডিও পাকিস্তান, করাচিতে প্রথম চাকরিতে যোগদান। তিন শতাধিক পরীক্ষার্থীর মধ্যে প্রথম স্থান লাভ করে এই চাকরি লাভ।

১৯৫৭ : অফিসার হিসেবে যোগদান, হাবিব ব্যাংক, করাচি, পাকিস্তান।

১৯৬৪ : উচ্চতর ব্যাংকিং প্রশিক্ষণ, লন্ডন গমন।

১৯৬৫ : সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, পাকিস্তান।

১৯৭২ : ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার, রূপালী ব্যাংক লিঃ, বাংলাদেশ।

১৯৭৫ : খ-কালীন শিক্ষকতা শুরু, ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষকতা করেন ২০০৬ সাল পর্যন্ত।

১৯৭৬ : জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে যোগদান ও পরবর্তীতে ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে পদোন্নতি, অগ্রণী ব্যাংক লিঃ, বাংলাদেশ।

১৯৮৩ : ম্যানেজিং ডিরেক্টর, সোনালী ব্যাংক, বাংলাদেশ।

১৯৮৫ : এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, বাংলাদেশ ব্যাংক।

১৯৮৬ : ‘বিকল্প’ মামলায় সামরিক আদালতের বিচারের রায়। ৮১ দিন কারাভোগের পর মুক্তিলাভ।

১৯৮৭ : চিফ অ্যাডভাইজার, ইসলামী ব্যাংক লিঃ।

১৯৯৫ : ম্যানেজিং ডিরেক্টর, প্রাইম ব্যাংক লিঃ।

১৯৯৬ : গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক।

১৯৯৯ : চিফ অ্যাডভাইজার, মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিঃ।

২০০৫ : ১৫ এপ্রিল ২০০৫ ব্যাংকিং চাকরি থেকে অবসর।

বই প্রকাশ

রম্যরচনা গ্রন্থ : দৈনন্দিন (১৯৬৭), সূর্যের সাত রং (১৯৭৬), জীবন যখন যেমন (১৯৮০), কতিপয় জনপ্রিয় কার্যকলাপ (১৯৮৮)।

ছড়ার বই : টিয়ে পাখির বিয়ে, নতুন বউ, খুকুমণির শ্বশুরবাড়ি।

সংকলন : হাদিসের বাণী (২০০২), বরণীয়জনের স্মরণীয় বাণী (২০০২)।

সম্পৃক্ততা : ট্রাস্টি, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইএম) এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা।

ব্যাংকার্স ক্লাব (পরবর্তীতে এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স) এর প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা ও প্রথম সভাপতি।

Comments (0)        Print        Tell friend        Top


Other Articles:
ড. আতিউর রহমানের ছেলেবেলা
অধ্যাপক ডঃ মুহাম্মদ ইউনূস



 
  ::| Events
December 2017  
Su Mo Tu We Th Fr Sa
          1 2
3 4 5 6 7 8 9
10 11 12 13 14 15 16
17 18 19 20 21 22 23
24 25 26 27 28 29 30
31            
 
::| Hot News
লুৎফর রহমান সরকার
ড. আতিউর রহমানের ছেলেবেলা
অধ্যাপক ডঃ মুহাম্মদ ইউনূস

Online News Powered by: WebSoft
[Top Page]