গুণীজন ডটকম Life story of Bangladeshi poets writers & famous persons

আবদুুল হাই মাশরেকী ছিলেন মূলসংস্কৃতির শিকড়ের আধুনিক কবি
Sunday, 04.24.2016, 07:02am (GMT6)



লোককবি আবদুুল হাই মাশরেকীর ৯৭তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত দুদিনব্যাপী  অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেছেন, আবদুল হ্ইা মাশরেকী ছিলেন মূলসংস্কৃতির শিকড়ের আধুনিক কবি। গ্রামের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের জীবনের রূপকার।
গত ২০ এপ্রিল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন- গীতিকবি ফেরদৌস হোসেন ভূঁইয়া, লোকসঙ্গীত গবেষক রফিকুল হক ঝন্টু, জাতীয় প্রেসক্লাবের যুগ্মসম্পাদক আশরাফ আলী, সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ সেলিম রেজা, অধ্যক্ষ আবু সাঈদ, আবৃত্তিশিল্পী মীর বরকত, কবি মাশরেকী গবেষণা কেন্দ্রের সহ সভাপতি নাসির উল্লাহ্ ভূঁইয়া ও কবিপুত্র মো. নঈম মাশরেকী। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন অভিনেতা ও নির্মাতা শংকর সাওজাল।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, কবির অমর বাণী ‘এবার জাগাও মোরে’ স্মারক করে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন বলেন, কবি আবদুল হাই মাশরেকী এদেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের জীবনের রূপকার। তাঁর গান মানুষের মনের ভেতরে নাড়া দিতে পেরেছিল বলেই তাঁকে নিয়ে আজ স্মরণ সভা হচ্ছে। কবি মাশরেকীর গান হৃদয়স্পর্শী । তাই তৃণমূল মানুষের কাছে যেতে পেরেছিলেন তিনি। আজকের প্রজন্মের জন্য কবি মাশরেকীদের নিয়ে আরো গতিশীল কাজ করা প্রয়োজন দেশ ও জাতির স্বার্থে।
গীতিকবি ফেরদৌস হোসেন ভূঁইয়া বলেন, কবি আবদুল হাই মাশরেকীর কবিতা-গান  গণমুখী ও মেলোডি। তাঁকে লোককবি শব্দে সীমাবদ্ধ করা যাবে না। তিনি মূলসংস্কৃতির শিকড়ের আধুনিক কবি।
লোকসঙ্গীত গবেষক রফিকুল হক ঝন্টু বলেন, আবদুল হাই মাশরেকীর গানের সাথে আমার পরিচয় ছোটবেলা থেকেই। কবি মাশরেকীর গানের ভা-ারের তথ্য আমাকে দিয়েছিলেন আমার স্যার সঙ্গীত শিল্পী হাফিজুর রহমান। লোকসঙ্গীত সংগ্রহ ও গবেষণা করতে গিয়ে কয়েকহাজার গানের মধ্যে পাঁচশ উপরে আমি কবি মাশরেকীর গান সংগ্রহ করেছি। যা আমাদের জাতীয় সম্পদ। তা সংরক্ষণ করা সরকারের দায়িত্ব বর্তায়। আমাকে সহযোগিতা করলে এই কবির আরো গান খুঁজতে সক্ষম হবো। আবদুল হাই মাশরেকী পল্লীগীতি শিরোনামে আগামীতে বই আকারে বের করে আপনাদের হাতে তুলে দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
জাতীয় প্রেসক্লাবের যুগ্মসম্পাদক আশরাফ আলী বলেন, কবি আবদুল হাই মাশরেকী যেখানে জন্মগ্রহণ করেছেন, সে অঞ্চলের আমি একজন হয়ে আজ গর্ববোধ করি। তাঁর সাহিত্যকর্ম প্রকাশে আমিও কাজ করবো। জাতীয় প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে কবির প্রতি জানাই শ্রদ্ধা।
সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ সেলিম রেজা বলেন, আমার মুক্তিযুদ্ধের উপর গানের বইয়ে কবি আবদুল হাই মাশরেকী বেশ কয়েকটি গান সংযুক্ত করতে পেরে আজ খুবই তৃপ্তি পাচ্ছি। তারই সাথে গর্ববোধ করি।
অধ্যক্ষ আবু সাঈদ বলেন, দুখু মিয়ার জারীতে কবি মাশরেকীর বাঙালী কবি সত্তার পরিচয় ঘটে। দুখু মিয়া জারী লিখে ও গেয়ে টাকা-পয়সা তুলে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে আর্থিক সাহায্য করেছিলেন। অন্যদিকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু নজরুলকে ভারত থেকে এনেছিলেন বাংলাদেশে জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়ে।
অভিনেতা ও নির্মাতা শংকর সাওজাল বলেন, কবি আবদুল হাই মাশরেকী যেভাবে পল্লী গান লিখেছেন, ঠিক পাশাপাশি তাঁর আধুনিক কবিতা-গান, গীতিনাট্য ও গল্প এক আলোক সৃষ্টির ভা-ার। তাঁর কালোর্ত্তীণ কবিতা পড়ে আমার শরীলের লোম দাঁড়িয়ে যায়। উজ্জীবিত করে। মাটি ও মানুষের প্রতি কি আবেগ-আপ্লুত হয় মন। তাই কবির ছবি দেখে মনে হয় আমার পিতা। যে পিতা আমার গ্রামসমাজের গণমানুষের। কবি মাশরেকীর ছবি দেখে যেমন বিস্মিত হই, তারই সাথে আমি তাঁকে বারবার সালাম জানাই।
আবৃত্তিশিল্পী মীর বরকত বলেন, আমার সৌভাগ্য হয়েছিলো গত দুবছর আগে কবি আবদুল হাই মাশরেকীর লেখা কবিতার আবৃত্তি সিডি বের করা সময় তাঁর কবিতা সম্পর্কে জানা। কবি মাশরেকীর রচিত ‘কিছু রেখে যেতে চাই’ জীবনের শেষ কবিতাটি আবৃত্তি করে আমার চোখের পানি মুছেছি। মাটির প্রতি, মানুষের প্রতি ভালোবাসায় তাঁর কি আর্তনাত, হতাশা, ব্যর্থতা মিশে সমাজের লাল-কালো রঙে কবির দীর্ঘজীবনের এক করুণ চিত্র।
আলোচনার পরে গুণীদের মাঝে সংর্বধনা দেয়া হয়। যারা সংবর্ধিত হলেন তারা হচ্ছেন-সাহিত্যে জীবন ইসলাম ও আফরোজা পারভীন, আফতাব আলী, কৃষি বিজ্ঞানে ড. এস এম আফসারুজ্জামান, আইন সেবায় শেখ জাহাঙ্গীর আলম, ক্রীড়ায় আবদুল আজিজ, শিল্প উন্নয়নে শিরিন খুরশিদ জাহান, মঞ্চ অভিনয়ে পাপিয়া সেলিম, সমাজ সেবায় মাহবুব নেওয়াজ চৌধুরী ও আক্তার হোসেন চৌধুরী, চিত্রশিল্পে ফায়জুল কবির, মুক্তিযুদ্ধে ও চিকিৎসায় ডা. নাজিম উদ্দিন আহমেদ।
শেষে কবির রচিত কবিতা ও বিখ্যাত গান ‘আল্লা মেঘ দে, পানি দেসহ বিভিন্ন জনপ্রিয়গান ওসমান খান ফাউন্ডেশন পরিবেশন করে।  
দ্বিতীয় দিন ২১ এপ্রিল বক্তব্য রাখেন- চিত্রশিল্পী সৈয়দ লুৎফুল হক, ড. এস এম আফসারুজ্জামান, আইনজীবি শেখ জাহাঙ্গীর আলম, ছড়াকার এম আর মঞ্জু, আবৃত্তি শিল্পী বদরুল আহসান খান, মাহবুব নেওয়াজ চৌধুরী প্রমুখ।
বক্তরা কবি আবদুল হাই মাশরেকীর জন্ম-মৃত্যু দিবস সরকারীভাবে পালন ও তাঁর সাহিত্যকর্ম সংরক্ষণের জোড় দাবি জানায়।
আলোচনা শেষে কবির রচিত ‘মানুষ ও লাশ’ গল্প অবলম্বনে পরিবেশিত হয় নাটক। ফয়সাল আহমেদের পরিচালনায় ‘নাট্যযোদ্ধা’ শিল্পীবৃন্দ এতে অংশগ্রহণ করে।
গল্পটি ১৯৪৩ সালের প্রেক্ষাপটে রচিত। সমাজের কিছু সংখ্যক ব্যক্তি নিজ স্বার্থ হাসিল করার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করে ফতোয় জারি করে। গল্পে দেখা যায় মূল চরিত্রে সাদি। মায়ের মৃত্যুতে সাদি ধর্মীয় শিক্ষা ও নামাজের প্রতি খুব আগ্রহ হয়ে গ্রামের একবৃদ্ধার কাছে শিখতে যায়। সাদির মনে বিশ্বাস আসে সে নামাজ ও কোরআন পড়ে তার মৃত মাকে শান্তিতে রাখতে পারবে। কিন্তু গ্রামের প্রভাবশালী তালুকদার সাহেব সাদির ধর্মীয় শিক্ষা ও নামাজ পড়া কোনো ভাবে ভালো চোখে নেননি। তালুকদারের কাজের ব্যঘাত ঘটবে দেখে তার স্বার্থের জন্য সাদিকে শারীরিক নির্যাতন করে যাতে কোনো দিন নামাজ ও কোরআন পড়তে না চায়। এই নির্যাতনে সাদি কোরআন ও নামাজ শিখতে ভুলে যায়। একসময় সাদি বড় হয়, বিয়ে করে। একটি দুধের গাভী তার সম্পদ হয়। সেই দুধের গাভীটি প্রতি তালুকদারের লোভ পড়ায় একদিন অসুস্থ সাদিকে তার বাড়ি থেকে বের করে দেয়। এই অবস্থায় সাদির মৃত্যু ঘটে। সাদির লাশ নিয়ে তালুকদার গ্রামের মোল্লা-মুন্সিদেরসহ বেনামাজি বলে ফতোয়া দেয়। তার জানাজার জন্য ‘কাফ্ফারা’ দিতে হবে। গল্প শেষে দেখা গেলো কাফ্ফারা হিসেবে সাদির দুধের গাভীটি তালুকদার ও তার মোল্লা-মুন্সিসহ সঙ্গ-পাঙ্গরা নিয়ে যায়। এভাবে কাহিনী শেষ হয়।