Monday, 05.20.2019, 03:57am (GMT+6)
  Home
  FAQ
  RSS
  Links
  Site Map
  Contact
 
আবদুুল হাই মাশরেকী ছিলেন মূলসংস্কৃতির শিকড়ের আধুনিক কবি ; লোককবি আবদুুল হাই মাশরেকীর ৯৭তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে শিল্পকলায় দুদিনব্যা ; লোককবি আবদুুল হাই মাশরেকীর ৯৭ তম জন্মজয়ন্তী আগামী ১ এপ্রিল ২০১৬ ; আল মুজাহিদী ; ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন
::| Keyword:       [Advance Search]
 
All News  
  গুণীজন সংবাদ
  বিপ্লবী
  ভাষা সৈনিক
  মুক্তিযোদ্ধা
  রাজনীতিবিদ
  কবি
  নাট্যকার
  লেখক
  ব্যাংকার
  ডাক্তার
  সংসদ সদস্য
  শিক্ষাবিদ
  আইনজীবি
  অর্থনীতিবিদ
  খেলোয়াড়
  গবেষক
  গণমাধ্যম
  সংগঠক
  অভিনেতা
  সঙ্গীত
  চিত্রশিল্পি
  কার্টুনিস্ট
  সাহিত্যকুঞ্জ
  ফটো গ্যাল্যারি
  কবিয়াল
  গুণীজন বচন
  তথ্য কর্ণার
  গুণীজন ফিড
  ফিউচার লিডার্স
  ::| Newsletter
Your Name:
Your Email:
 
 
 
কবি
 
আল মাহমুদ




      মানবজীবনের চলমান অথচ বৈপরিত্য কিংবা উৎসাহ উদ্দীপনার সমস্ত ঘটনা এবং ঘটনার ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি সুক্ষ্ম বিশ্লেষণের মাধ্যমে এর প্রভাব প্রতিক্রিয়া ও ফলাফল জনসাধারণের সামনে উপস্থাপন করে সংবাদপত্র। এ বিশাল মিশন পরিচালনা করেন সাংবাদিক। এ জন্য এটি একটি মহৎ পেশা এবং এ পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদেরকে দেশ ও জাতির বিবেক বলা হয়ে থাকে। মূলত সাংবাদিকতা হচ্ছে ব্যক্তি, গোষ্ঠী, জাতি তথা রাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা এবং সুক্ষ্ম বিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভুল-ত্রুটির সংশোধনের নিমিত্তে সঠিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত উপস্থাপনের পথ তৈরী করে দেয়া।


আল মাহমুদ একজন কবি। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রধান কবি। আপাদমস্তক কবিতার পংক্তিতে সুসজ্জিত তিনি। তাঁর লোমকুপের আস্তিনে, শরীরের ভাঁজে ভাঁজে কিংবা শিরা-উপশিরা এবং রক্ত কণিকার মিছিলে মিছিলে সর্বক্ষণ কবিতার নদী খেলা করে। তাঁর নামের সাথে কবি শব্দটি যুক্ত না করলে বড়ই বেমানান দেখায়। যেন প্রকৃতিগত ভাবেই তাঁর নাম ‘কবি আল মাহমুদ’। কবিতার ঢেউয়ের উচ্ছ্বলতার নিচে বোয়াল মাছের মতো আরও একটি সত্ত্বা তাঁর ভিতরে একান্ত নীরবে বিলি কেটে চলে- তিনি ‘সাংবাদিক আল মাহমুদ’। কবি সত্ত্বার তরঙ্গমালায় কোন প্রকার হৈ হুল্লোড় ছাড়াই আপন আঙ্গিকে, আপন সঙ্গীতে নিজস্ব গতিপথে নীরব পথিকবেশে জীবনানন্দ দাশের মতো হেঁটে চলেছেন বনলতা সেনের খোঁজে হাজার বছর ধরে; কিংবা ফররুখ আহমদের সিন্দাবাদের মতো সমুদ্র থেকে সমুদ্রে সাংবাদিকতার মিশন নিয়ে। সত্যিকার অর্থে আল মাহমুদের কবি সত্ত্বার মোড়ে মোড়ে যে বেতার, যে অডিও-ভিডিও অস্থিমজ্জায় সাবলিল গতিতে প্রবাহমান তা তাঁর সাংবাদিক সত্ত্বা, এবং তার সফলতার সাথে বিজয়ের বেশে। তাঁর অসাধারণ গদ্য সাহিত্য এ পথেরই কৃতিত্ব।

আল মাহমুদ বেড়ে উঠেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। সংবাদপত্রে লেখালেখির সুত্র ধরে কবি ঢাকা আসেন ১৯৫৪ সালে। সমকালীন বাংলা সাপ্তাহিক পত্র/পত্রিকার মধ্যে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী সম্পাদিত ও নাজমুল হক প্রকাশিত সাপ্তাহিক কাফেলায় লেখালেখি শুরু করেন। তিনি পাশাপাশি দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে সাংবাদিকতা জগতে পদচারণা শুরু করেন। ১৯৫৫ সাল কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী কাফেলার চাকরি ছেড়ে দিলে তিনি সেখানে সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। কাফেলা এবং মিল্লাত এ দুটি পত্রিকার চাকরির মধ্যদিয়ে সাংবাদিকতা জগতকে চিনতে শুরু করেন তিনি। এ যাত্রায় সিকান্দার আবু জাফরসহ অনেকের সাথেই তার পরিচয় ও সখ্য গড়ে ওঠে। এভাবে প্রায় ৮/৯ বছর সাংবাদিকতার জগতে সাঁতার কেটে নিজেকে তিনি অনেকটাই সাবলম্বী করে তুলেছেন। সেই সাথে তার লেখা কবিতা ঢাকা এবং কোলকাতার বিভিন্ন পত্র/পত্রিকায় যত্নের সাথেই ছাপা হতে থাকে। ১৯৬৩ সালে তিনি দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে যোগ দেন এবং দ্রুত কর্মদক্ষতা, যোগ্যতা ও একনিষ্ঠতা দিয়ে এ বিখ্যাত পত্রিকার মফস্বল সম্পাদকের দায়িত্ব লাভ করেন।

ইত্তেফাকে চাকরিকালীন তিনি ইত্তেফাকের নিউজ এডিটর সিরাজ উদ্দীনের স্নেহ ও সহচার্য পান। তিনি তাকে হৃদয় দিয়ে ভালবাসতেন বলে সাংবাদিকতার বিভিন্ন বিষয় আরো সুন্দরভাবে জানা হয়ে যায় কবির। সেই সাথে সাব এডিটর তোহা খান (আবেদন খানের বড় ভাই) তাঁকে মফস্বল বিভাগে দায়িত্ব পালনে ব্যাপক সহযোগিতা করেন। এ সময় তার নিবন্ধ প্রবন্ধ ও কবিতা ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন পত্র/পত্রিকায় খুব সুনাম অর্জন করে। সাংবাদিকতা জগতের স্মৃতি কথায় তিনি উল্লেখ করেন-

“পাকিস্তান আমলের একটা কথা বলি। আমি তখন ইত্তেফাকে মফস্বল এডিটর। মফস্বল এডিটর মানে প্রাদেশিক নিউজের চার্জে আছি। আমার কাছেই সবাই আসে। আমার টেবিলে সর্বদা ভিড় লেগে থাকে। আর কোথাও ভিড় নেই। এই সময় একটা খবর পাই যে, অভাবের তাড়নায় দেশের উত্তরাঞ্চলের মেয়েরা চুল বিক্রি করে ফেলেছে। এটা বাংলাদেশ হবার প্রায় চার বছর আগের কথা। মফস্বল এডিটর হিসেবে আমার কাছে এই নিউজটা আসে। আমি এই নিউজের উপর একটা নিউজ দাঁড় করালাম। চুলের ইতিহাস দিয়ে বাঙালী মেয়েদের চুল সম্পর্কে আগে কে কি বলেছেন, অতীত ইতিহাস টেনে একটা নিউজ লিখলাম। লিখে আমি নিউজ এডিটর সিরাজ উদ্দিন সাহেবের কাছে গেলাম। উনাকে আমি নিউজটা দিয়ে বললাম, প্রথম পাতায় এটা দেয়া দরকার। তিনি বললেন- ও আচ্ছা দিয়ে দে। তুই করে রেখে যা। তিনি আরো বললেন, মফস্বল নিউজ ফার্স্ট পেজে দিতে চাস? এরপর পাশের রুমে এসে আমরা সিগারেট খাচ্ছি। উনার সামনে আমরা অনেকেই সিগারেট খেতাম না। সিরাজ ভাই হঠাৎ নিউজটা হাতে নিয়ে উঠে চলে আসলেন। এ রকমটি কখনো তিনি করেন না। এসেই হাঁক ছাড়লেন, কিরে কি করছিস? আমি বললাম চা খাচ্ছি। আসলে তো সিগারেট খাচ্ছি। ধুয়া দেখেই উনি আর ভিতরে ঢোকেননি। শুধু বললেন- তোর নিউজ পড়লাম। হ্যাঁ এটা নিউ নিউজও হতে পারে। তবে তুই নিজউটা আবার পড়। নিউজের ভেতর ত্রুটি আছে। আমি আবার পড়ি। বুঝতে পারছি না। এমন ফার্স্টক্লাস লিখেছি। আমার গদ্য ভালো। অহংকারই হলো। সিরাজ ভাই আমার সামনে এরকম (হাত দিয়ে দেখিয়ে) ঢিল দিয়ে ফেলে দিয়ে বললেন, ভালো করে পড়। আমি আবার পড়লাম, কিছুই ধরতে পারি না। তখন উনি করলেন কি দ্যাখো, এদিকে আয় বলে ডাকলেন। উনি যেখানে বসেন তার পিছনে আমাকে দাঁড় করালেন। আমি দাঁড়িয়ে আছি। উনি শুধু লাস্ট ্লিপটা ছিঁড়ে সেটা সামনে এঁটে দিলেন। বললেন- এটা ইনট্রো কর। এটা ইনট্রো করে পড়াতো, পড়লাম। পড়ে একদম বেকুব হয়ে গেলাম। গোটা নিউজটা একদম চেঞ্জ হয়ে গেছে। তখন বললেন, কি ঠিক আছে? ওকে, এটা সেকেন্ড লিড করে দিলাম। পরের দিন রয়টার ইত্তেফাককে ফোন করলো নিউজটার জন্য। এই যে ব্যাপার, সাংবাদিকতা এদের কাছে শিখেছি। তখন নিউজের মধ্যে সাজাবার গোছাবার, নিউজটার গুরুত্ব বোঝাবার নানা পদ্ধতি ছিল। সংবাদপত্র ছিল একটা ইনস্টিটিউটের মতো। “ (চাড়ুলিয়া, ওমর বিশ্বাস সম্পাদিত জুলাই-আগষ্ট সেপ্টেম্বর ২০০১, পৃ· ১৯৪-৯৫)
মিল্লাত ও ইত্তেফাক এর মত বড় পত্রিকার প্রুফরিডারের দায়িত্ব পালন করার কারণে অনেক নতুন পুরাতন ঘটনাবলী এবং নিত্য নতুন শব্দাবলীর সাথে পরিচয় হবার সুযোগ হয়েছে তার। সেইসাথে শব্দের বানান, বাক্যের গঠন, বিন্যাস, ভাষাগত ত্রুটি বিচ্যুতি চিহ্নিত করে তা সংশোধনের অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়েছে। একজন সচেতন কবি ও সাংবাদিক হিসেবে এটি তাঁর জন্য ছিল ধাপ অতিক্রমের অসাধারণ বাহন। অভিজ্ঞতার সিঁড়িতে পৌঁছে তিনি ইত্তেফাকের মফস্বল সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে করতে গ্রামীণ জীবন-জীবিকা, জীবনের বাকময়তা, সমস্যা সম্ভাবনামূলক বহুমুখী অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। গদ্য-সাহিত্যের তেলেসমাতি এবং কবিতা গ্রামীণ ঐতিহ্য ও ভাষা ব্যবহারের নিখুঁত অলংকরণ এ অধ্যায়ের সমৃৃদ্ধ অভিজ্ঞতারই ফসল।
১৯৬৮ সালে দৈনিক ইত্তেফাক বন্ধ হয়ে গেলে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড· সৈয়দ আলী আহসান এর আহবানে চট্টগ্রাম চলে যান। চট্টগ্রাম আর্ট প্রেসে কাজ করার সময় অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের আরেক সুযোগ মেলে তার। সেখানে আঞ্চলিক গানের বিখ্যাত শিল্পী প্রয়াত শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণবের সাথে তার পরিচয় হয়। শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব তখন আট প্রেসের মেশিনম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি পরিবারসহ যে বাসায় থাকতেন সেখানে একটি কক্ষ নিয়ে আল মাহমুদও তাদের সাথে থাকতেন। চট্টগ্রামে থাকা অবস্থায় সেখানকার বিশিষ্ট প্রকাশনী সংস্থা বইঘর-এর প্রকাশনা কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় লোকজ শব্দ গ্রাম্য জীবনের চিত্র গানের ভাষা থেকে উদ্ধার করা এবং প্রকাশনী জগতের ব্যাপারে এক অমূল্যবান অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। চট্টগ্রামে যাবার বিষয়ে আল মাহমুদ উল্লেখ করেন-

“ইত্তেফাক একবার বন্ধ হয়ে গেল। তখন কই যাব? প্রফেসর আলী আহসান সাহেব নিয়ে গেলেন আমাকে চিটাগাং। তিনি তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যায়ের ভাইস চ্যান্সেলর। উনাদের কিছু কাজ হচ্ছিল আট প্রেসে। দুটো পত্রিকা বের হয় আর্ট প্রেস থেকে। সেখানে এখলাস উদ্দীন আহমদ ছিলেন। আমাকে উনি বললেন, তুমি বসে থাকো এখানে, দেখাশুনা করো। তোমার তো মাস এতো টাকা দরকার সেটা দিয়ে দেব। আবার ইত্তেফাক বের হলো। সিরাজ ভাই আমাকে খবর দিলেন, চলে আসলাম।” (চাড়ুলিয়া, পৃ· ১৯৯) উল্লেখ্য কবি আল মাহমুদ তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ সোনালি কাবিন চট্টগ্রামে বসেই লেখেন। তিনি ১৯৬৮ সালের সেপ্টেম্বরে এ কাব্যের প্রথম সনেট শুরু করেন এবং ১২ ডিসেম্বরে ১৪ নং সনেটটি রচিত হয়।

দৈনিক ইত্তেফাক পুনরায় চালু হলে তিনি সেখানে সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সে পদে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি তৎকালীন মুজিবনগর সরকারের ৮ নং থিয়েটার রোডে প্রতিরক্ষা বিভাগের স্টাফ হিসেবে যোগ দেন এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি বিভিন্নভাবে কোলকাতায় থেকে সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। দেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭২ সালে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের বিশ্বাসীদের মুখপত্র এবং আওয়ামী সরকারের শ্বেতপত্র হিসেবে বিবেচিত সরকার বিরোধী এক মাত্র রেডিক্যাল পত্রিকা দৈনিক গণকণ্ঠ এর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। গণকণ্ঠে সম্পাদকের দায়িত্বগ্রহণ প্রসঙ্গে কবি আল মাহমুদ বলেন-
“তখনো চতুর্দিকে গুলির শব্দ। রাত ঘনিয়ে আসে বর্বরতাকে প্রশ্রয় দেবার জন্য। অবস্থায় কী করি কোথায় যাই। আমার সঞ্চিত অর্থও প্রতিদিনের পারিবারিক প্রয়োজনে খরচ হয়ে যাচ্ছে। ঢাকার প্রতিটি মানুষ আতঙ্কের মধ্যে আছে। কারণ পাকিস্তানী বাহিনী আত্মসমর্পণের পর ঢাকা কয়েক দিনের জন্য জঙ্গলের রাজত্বে পরিণত হয়েছিল। ··· যখন নিরূপায়ভাবে নিজের ঘরে নিজেই বন্ধির মতো আছি ঠিক সে সময় আমার পূর্ব পরিচিত এক ছাত্রনেতা আফতাব আহমদ এসে আমার দরজায় কড়া নাড়লেন। আমি দরজা খুলে দাঁড়াতেই দেখি আফতাব। আমি বললাম, কখন ফিরলে? আফতাব আমার কথার জবাব না দিয়ে বলল, এক্ষুণি চলুন। ‘ভেতরে এসে এককাপ চা খাও আফতাব’। ‘চা যেখানে আপনাকে নিয়ে যেতে চাই সেখানে গিয়ে খাব।’ আমি আফতাবকে বহুদিন ধরে জানতাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল সায়েন্সের তুখোড় ছাত্র। ছাত্রলীগ নেতা এবং আমার বিশেষ অনুরাগী। আমি মুখ ঘুরিয়ে আমার স্ত্রীকে উচ্চস্বরে বললাম, ‘আমি আফতাবের সঙ্গে বেরোচ্ছি। অযথা টেনশনে থেকো না। আমি আফতাবের সঙ্গে এই প্রথম একজন মুক্তিযোদ্ধার আহবানে চৌকাঠ পেরুলাম। আফতাব আমাকে নিয়ে চলে এলো আমার চিরপরিচিত এলাকা ও এককালের বসবাসের এলাকা ব্যাংকিং স্ট্রিটে। অতীত ঢাকার সবচেয়ে উচ্চবিত্তদের এক কালের আবাসিক এলাকা।··· একটি বাড়ির সামনে এসে আফতাব আমাকে নিয়ে নেমে পড়ল। ভেতরে বেশ কর্মচাঞ্চল্য দেখতে পেলাম। এসে ছাপার কাজ চলছে। আমাকে নিয়ে নিচের তলায় একটি সুন্দর কামরায় আফতাব ঠেলে বসিয়ে দিল এবং দ্রুত একটি সম্পাদকীয় লেখার জন্য প্যাড এগিয়ে দিয়ে বললেন, লিখুন।···· বললাম এ পত্রিকার সম্পাদক কে? আপনি। আফতাব আমাকে নিশ্চিত করেছিল যে, এতে সিরাজুল আলম খান, আসম আব্দুর রব, কাজী শরিফ ও গোলাম আম্বিয়াসহ সবারইপূর্ণ সম্মতি আছে। আজ বন্ধু আসছেন। এই শিরোনাম নিয়ে প্রকাশিত হয়ে গেল দৈনিক গণকণ্ঠের প্রথম সংখ্যা। (বিচুর্ণ আয়নায় কবির মুখ, পৃ· ১১৭-১৮)

গণকণ্ঠের সম্পাদনার সময় এক অনন্য অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের পাশাপাশি জাতীয় দায়িত্ব পালনের মত বড় একটি ঝুঁকিপূর্ণ সাহসী কর্মে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন কবি। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ভারতীয় বাহিনীর তাণ্ডব ও সরকারের নতজানু নীতির বিরুদ্ধে একাই যুদ্ধ করেছে এ পত্রিকাটি। তাই একদিকে যেমন ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পত্রিকার বিরুদ্ধে কঠোর তেমনি আওয়ামী সরকার বিভিন্ন কৌশলে এ পত্রিকাকে রোধ করতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ছিল। সেই সাথে এ সাহসী পত্রিকার একজন কবি সম্পাদককে এ পথ থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য সর্বক্ষণ প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হত। এমন কি গাড়িতে যাতায়াতের সময় গুলির ভয়ে রাস্তায় তাঁকে মাথা নিচু করে পথ পাড়ি দিতে হত। আল মাহমুদ বলেন, “আমার তো দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, আমাকে গুপ্ত ঘাতকদের হাতে প্রাণ দিতে হবে। কিন্তু যে কোন কারণেই হোক হারমানা আমার স্বভাবের মধ্যে স্থান করে নিতে পারেনি।” (বিচুর্ণ আয়নায় কবির মুখ, পৃ· ১২৬)

কবি আল মাহমুদ সাহসিকতার সাথে স্বনামে অনেক সম্পাদকীয় এবং নিবন্ধ রচনা করে সরকারের দূর্নীতির সরাসরি বিরোধিতা করেছেন। গণকণ্ঠের ১ম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে আল মাহমুদ নির্ভীকভাবে একটি বিশাল সম্পাদকীয় লেখেন-
কোনো হুমকির কাছে মাথা নত করবো না

আজ ১০ই জানুয়ারি। গণকণ্ঠ পত্রিকার বয়স আজ এক বছর পূর্ণ হল। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অতীতে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের একটা সুখ্যাতি ছিল। মুসলিম লীগ আমলের অগণতান্ত্রিক দিনগুলোতে এবং আইয়ুব, ইয়াহিয়ার মিলিটারী ডিকটেটরীর আমলে ও বাংলদেশের সাংবাদিকরা এবং দু’একটি পত্রিকা যে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছে তা এদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে গৌরবময় অধ্যায়। ১৯৭১ সনের ২৫ শে মার্চ হতে ১৬ই ডিসেম্বর ভয়ঙ্কর দিনগুলোতে দৈনিক পত্রিকাগুলো বাঙ্গালী জাতির স্বার্থ রক্ষা করতে পারেনি, বরং বলা যায় পাক সরকারের সাথে সহযোগিতা করেছে। স্বাধীন বাংলার বুকে ইংরেজী দৈনিক দি পিপলস বাংলার, দৈনিক গণ বাংলা, সংবাদ, বাংলার বাণী, সমাজ ও গণকণ্ঠ আত্মপ্রকাশ করে। স্বাভাবিক ভাবে আশা করা হয়েছিল যে, এসব পত্রিকা সাংবাদিকতার মাধ্যমে সমস্ত সংগ্রাম অভিজ্ঞ জাতির রাজনৈতিক জীবনে নতুন দিগদর্শন দিতে সক্ষম হবে। অন্য সব পত্রিকা কে দায়িত্ব পালন করেছে দেশবাসী তা বিবেচনা করবেন। কিন্তু গণকণ্ঠ প্রথম দিন থেকে আজ অবধি তার বিঘোষিত নীতিতে অবিচল অটল অনঢ়। গণকণ্ঠ নির্ভেজাল সাংবাদিকতায় বিশ্বাসী। সত্যকে জনসমক্ষে তুলে ধরা, মিথ্যাকে যে কোন পরিস্থিতিতে ধামাচাপা না দেওয়া, গণকণ্ঠের প্রকাশ্য অঙ্গীকার। আমাদের ঘুনেধরা সমাজে উপরের স্তর থেকে নীচের স্তর পর্যন্ত দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির যে স্রোত বইছে, দেশ শাসনের নামে শাসক শ্রেণীর যে সুবিধাবাদী চরিত্র বিদ্যমান। আমাদের শ্রেণী বিভাগ সমাজে উচ্চ শ্রেণী কর্তৃক কৃষক-শ্রমিক-মধ্যবিত্ত-বুদ্ধিজীবি সমবায়ে গঠিত মেহনতী শ্রেণীকে শোষণ করার যে প্রক্রিয়া আইনগতভাবে বিধিবদ্ধ এর বিরুদ্ধে এবং সরকার কর্তৃক যে কোন নিপীড়ন ও নির্যাতন মূলক পদ্ধতি সম্পর্কে তথ্য ও বিশ্লেষণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করা ও প্রতিবাদ মুখর হওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমরা ব্যক্তিপুজায় বিশ্বাসী নই এজন্য আমরা প্রত্যেকেরই সমালোচনা করি এমনকি আত্মসমালোচনা করতে দ্বিধাবোধ করি না। আর সে কারণেই আমরা সরকারের উপরস্থ ব্যক্তি হতে শুরু করে ক্ষমতাসীন দল আমলা গোষ্ঠী ও সরকারী প্রশাসনযন্ত্রের বিরাগভাজন হয়েছি। এখানেই শেষ নয়। ক্ষমতার দর্পে দর্পিত মহল বিশেষের প্রকাশ্য হুমকি, টেলিফোনে অকথ্য ভাষায় গালাগাল ও গুপ্তহত্যার ভয় এবং সরকারী আইনের মারপ্যাঁচ দেখিয়ে আমাদের কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সাংবাদিকতায় আমরা যেমন ভূঁইফোড় নই, তেমনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে আমাদেরকে ইচ্ছা করলেই যে কেউ টুটি চেপে হত্যা করতে পারবে এটাও ভাবা ঠিক নয়। কারণ সকল মহলকেই স্মরণ রাখতে হবে, আজ আমরা ৫২, ৫৪, ৫৮, ৬২, ৬৯, ৭১ খ্রীষ্টাব্দে বাস করছি না। আমরা ‘জয় বাংলা ধ্বনির উদগাতা, জাতীর পতাকার না করা ও উত্তোলক , জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচক এবং স্বাধীনতার প্রথম ইশতেহারের উচ্চারক। আমরা স্বাধীনতা সংগ্রামের মূলশক্তি এবং সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ গ্রহণকারী যুবশক্তি এবং মেহনতী মানুষের প্রতিভূ হয়ে ১৯৭৩ খ্রীষ্টাব্দে অবস্থান করছি। আমরা প্রকাশ্যে ঘোষণা করছি, এ লড়াই বাঁচা মরার লড়াই, এ লড়াইয়ে জিততেই হবে। মুসলিম লীগ সংবাদ, অবজার্ভার বন্ধ করে দিয়েছিল; আইয়ুব ইত্তেফাক এর কণ্ঠ রোধ করেছিল ইয়াহিয়া, সংবাদ ও দি পিপলস্ চালু করতে দেয়নি, কিন্তু এতে আন্দোলনের গতিধারা কি স্তিমিত হয়েছিল। অতীতের স্বৈরাচারী ও একনায়কবাদী সরকার অসংখ্য দেশ প্রেমিককে জেলে পুরেছে, ছাত্র শ্রমিক বুদ্ধিজীবিদেরকে হত্যা করেছে, গুলী ও বেয়নেটের আঘাতে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে এবং তিরিশ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে, কিন্তু মুহূর্তের জন্যেও কি জনতার সংগ্রামী কাফেলার অগ্রগতিকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। আসুন ইতিহাসের দিকে তাকাই। হিটলারের গোস্টাপের বাহিনী, মুসলিনীর ব্ল্যাকবশার্চ বাহিনী, চিয়াং কাইশেকের সেনাবাহিনী বা বাতিস্তার পশুশক্তি কি বিপ্লবী জনতার অসংখ্য কে নিশ্চিহ্ন করতে পেরেছে। আর ভিয়েতনাম। ভিয়েতনামীরা তো বিশ্বের মুক্তিকামী জনতার আশার প্রতীক। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, ব্যক্তি নয় আদর্শ, আপোষ নয় সংগ্রামই হলো জাতীর জীবনের হৃদস্পন্দন।


ইতিহাসের সেই ক্রান্তিলগ্নে আমরা দাঁড়িয়ে। ক্ষমতায় আসীন মহলের দাপট ও স্বৈরী মনোভাব আমাদের বিপ্লবী মনোভাবকে ক্ষণকালের জন্যও বিচলিত, বিভ্রান্ত বা স্তব্ধ করতে পারবে না। আমরা যে কোন পরিস্থিতির মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত। প্রাণ দেব কিন্তু আদর্শ থেকে বিচ্যুত হবো না। কোন হুমকির কাছেই মাথা নত করবো না।

সেই সময় গণকণ্ঠ ও আল মাহমুদের সাহসীক ভূমিকা দেশে বিদেশে ব্যাপক হৈ চৈ ফেলে দেয়। এক পর্যায়ে মুজিব সরকারের রোষানলে পড়ে পত্রিকাটি। ১৯৭৪ সালের মার্চে আল মাহমুদকে গ্রেফতার করা হয় এবং কারাগারে প্রায় দশ মাস থাকতে হয় তাঁকে। তার গ্রেফতারের মাত্র তিনদিন পর দৈনিক গণকণ্ঠও বন্ধ করে দেয়া হয়। দীর্ঘ ১০ মাসে জেলের অসহ জীবন যাপন করতে হয় তাকে। আল মাহমুদকে প্রশ্ন করা হয়েছিল- যদি আপনাকে পেশা হিসেবে বেছে নেবার জন্য সুযোগ দেয়া হয় তাহলে আপনি কোন পেশা বেছে নেবেন? তিনি উত্তরে বলেছিলেন- ‘সাংবাদিকতাই করতাম। সাংবাদিকতার মধ্যে এক ধরনের আনন্দ আছে। আর কোন চাকরি আমার অতো ভালো লাগেনি। (চাড়ুলিয়া, পৃ· ২০১)।

প্রকৃতপক্ষে আল মাহমুদের শুধু পেশা ও নেশা হিসেবেই সাংবাদিকতা পছন্দ তা নয়, নিজে একজন সফল সাংবাদিক ছিলেন বলেই জবসেটিসফেকশন নিয়ে এ পেশায় আনন্দ অনুভব করেন। তিনি উড়ে এসে জুড়ে বসে সোহাগী সাংবাদিক ও সম্পাদক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেননি। বরং সাংবাদিকতার ভিত্তি থেকেই তার উত্থান। তিনি নিজেই একথা বলেন-

“এরপর জুনিয়র সাব এডিটর, সিনিয়র সাব এডিটর, তারপর এডিটর হয়েছি। আমি হঠাৎ একদিনে সম্পাদক হয়ে যাইনি, সংবাদপত্রের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে এসেছি। এ জন্যে সংবাদপত্রের সবটা আমি জানি। সংবাদপত্র যেভাবে গঠিত হয় কিভাবে পরিচালিত হয় আমি জানি। ···· উত্তরাধিকার সূত্রে আমি সম্পাদক ছিলাম না। এটা আমার পেশা। পেশাগত দক্ষতার কারণে আমি সামান্য প্রুফ রিডার থেকে সম্পাদক হয়েছি।” (চাড়ুলিয়া, পৃ· ১৯১) সত্যিকারভাবে মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, আল মাহমুদ শুধু প্রধান কবিই নন, তিনি যেমন সফল প্রাবন্ধিক, কথা সাহিত্যিক, তেমনি একজন উঁচুমানের সফল সাংবাদিক ও সম্পাদকও বটে। আজও বিভিন্ন পত্র/পত্রিকার সাথে তার সম্পৃক্ততা এ কথারই প্রমাণ করে।

লেখকঃ

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়,


Comments (0)        Print        Tell friend        Top


Other Articles:
ফররুখ আহমদ
রেজাউদ্দিন স্টালিন
সুকুমার রায়
কবি শামসুর রাহমান
মহসিন হোসাইন
মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত
কে জি মোস্তফা
 কাজী নজরুল ইসলাম
জীবনানন্দ দাশ
কবি-প্রাবন্ধিক-গবেষক আবদুল মান্নান সৈয়দ



 
  ::| Events
May 2019  
Su Mo Tu We Th Fr Sa
      1 2 3 4
5 6 7 8 9 10 11
12 13 14 15 16 17 18
19 20 21 22 23 24 25
26 27 28 29 30 31  
 
::| Hot News
আল মুজাহিদী
কবি আবদুল হাকিম
কবি নির্মলেন্দু গুণ : গুণীজন techtunes bdnews24 bangladesh dse bdjobs alo prothom alo পড়ুন&
সুকান্ত ভট্টাচার্য
বুদ্ধদেব বসু
লোককবি আবদুল হাই মাশরেকী
কবি মনিরউদ্দীন ইউসুফ
হেলাল হাফিজ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কবি কায়কোবাদ

Online News Powered by: WebSoft
[Top Page]