গুণীজন ডটকম Life story of Bangladeshi poets writers & famous persons

আল মুজাহিদী
Friday, 05.22.2015, 02:34am (GMT6)


আল মুজাহিদী (জন্মঃ ১ জানুয়ারি ১৯৪৩) বাংলাদেশের একজন কবি ও সাহিত্যিক। তিনি ষাট দশকের কবি হিসাবে চিহ্নিত। তিন দশকেরও অধিক সময় ধরে তিনি দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। তিনি ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। কবিতা ছাড়াও তিনি গল্প, উপন্যাস, সমালোচনা ইত্যাদি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অবদান রেখেছেন। শিশু সাহিত্যেও তাঁর অবদান উল্লেখযোঘ্য।

জন্মস্থান ও জন্মতারিখ : টাঙ্গাইল, ১ জানুয়ারি ১৯৪৩। পিতা : আবদুল হালিম জামালী ও মাতা : সাখিনা খান। স্ত্রী : পলিন পারভীন। ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি ভিক্টোরিয়া হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে টাঙ্গাইলের করটীয়া সাদত কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন্। স্নাতক (কলা) : জগন্নাথ কলেজ, ঢাকা (১৯৬৪); স্নাতকোত্তর (সমাজবিজ্ঞান) : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬৬); স্নাতকোত্তর (বাংলা ভাষা ও সাহিত্য); ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬৭)। জীবনের শুরু থেকেই তিনি সাংবাদিকতায় নিযুক্ত।  ২০১২ খ্রিস্টাব্দে তিনি যায়যিায় দিন পত্রিকায় সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন।

প্রকাশিত গ্রন্থাবলী:
       কবিতা:

    হেমলকের পেয়ালা;
    ধ্রুপদ ও টেরাকোটা;
    যুদ্ধ নাস্তি;
    মৃত্তিকা অতি-মৃত্তিকা;
    প্রিজন ভ্যান;
    দিদেলাস ও ল্যাবিরিস্থ;
    ঈডের হ্যামলেট;
    প্রাচ্য পৃথিবী;
    পৃথিবীর ধুলো,
    সৌর জোনাকি;
    ভিতা নুওভা,
    অ্যাকাডেমাসের বাগান;
    আল মুজাহিদীর শ্রেষ্ঠ কবিতা;
    সআল মুজাহিদীর প্রেমের কবিতা;
    সন্ধ্যার বৃষ্টি;
    কালেরবন্দীতে;
    পাখির পৃথিবী;
    আলবাট্রাস,
    ভঙুর গোলাপ;
    কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি;
    পালকি চলে দুলকি তালে।

     উপন্যাস:

    প্রথম প্রেম;
    চাঁদ ও চিরক’ট;
    মিলু এট ও স্যোন্যাটা;
    লাল বাতির হরিণ;
    রূপোলি রোদ্দুর;
    আলোর পাখিটা;
    ছুটির ছুটি;
    খোকার আকাশ;
    খোকার যুদ্ধ।

      ছোটগল্প:

    প্রপঞ্চের পাখি;
    বাতাবরণ;
    ভরা কটাল মরা কটালের চাঁদ।

গবেষণা গ্রন্থ:

    কালান্তরের যাত্রী।

   শিশু সাহিত্য:

    হালুম হুলুম;
    তালপাতার সেপাই;
    শেকল কাটে খাঁচার পাখি;
    সোনার মাটি রূপোর মাটি;
    ইস্টিশানে হুইসেল।

        প্রবন্ধ:

    সমাজ ও সমাজতত্ত্ব।

    অনুবাদ:

    কাইফি আজমির কবিতা;
    পৃথিবীর কবিতা;
    আহমদ ফরাজের কবিতা;
    ঊর্দূ কবিতা;
    হিন্দি কবিতা;
    হাইনরীশ হাইনে-র কবিতা।


আল মুজাহিদী বাংলা কবিতাঙ্গনে অতি পরিচিত একটি নাম। তিনি একাধারে কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক ও ছড়াকার। তিনি ষাটের দশকে কবিতা লেখার সূচনা করেন। তার কাব্যভাষার একটি উল্লেখযোগ্য স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর আছে। মানুষের জীবন পরিবর্তনশীল এবং যেহেতু কবিতা জীবনেরই প্রতিচ্ছবি, তাই আল মুজাহিদীর কবিতাও সময়ে বাঁক বদল করেছে। আর কে না জানে, প্রকৃত কবিত্বশক্তি ছাড়া কবিতার রূপান্তর একটা দুরূহ কাজ। জনপ্রিয়তার পেছনে তিনি ছোটেননি বরং যথার্থ কবিতা রচনায় একজন প্রকৃত কবির মতোই কষ্টসাধ্য পথ পাড়ি দিয়েছেন এবং এই প্রবীণ বয়সেও কলমকে সচল রেখেছেন। আল মুজাহিদীর প্রথম দিকের কবিতায় দেশপ্রেম ও নারীর প্রতি হৃদয়ের আবেদন মিলেমিশে একাকার হয়েছে। জেলে বন্দী থাকা অবস্থায় কবি লিখেছিলেন :
আমি অনেকদিন দেখিনি তোমার সফেন উত্তাল হৃদয়
জলরাশি
জলজবীথির পারিজাত সবুজ ঘাসের দ্বীপমালা উপত্যকা
নিঃসীম নীলিমা
তোমার নক্ষত্রের ঘাসফুল পাখি পতঙ্গের চলাফেরা
অনেকদিন দেখিনি
(কারাবন্দী : হেমলকের পেয়ালা)
পৃথিবী আজো যুদ্ধজর্জরিত এবং সাম্রাজ্যবাদীশক্তি তাদের নিজেদের স্বার্থেই বিভিন্ন দেশে কৌশলে যুদ্ধকে টিকিয়ে রাখছে, নয়তোবা নতুনভাবে যুদ্ধের সূচনা করছে।
‘‘এখনো নেভেনি! পৃথিবীর অস্থিগুলো
জলন্ত অঙ্গার
ধবংসস্তূপগুলো, মৃত ভস্মরাশি
এখনো নেভেনি
হিরোশিমা এখনো নেভেনি তোমার দগ্ধতা’’।
[অন্তরীক্ষে জাগর দাহন : কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি]
তিরিশ বছর আগের লেখা আল মুজাহিদীর কবিতা এখনো সমান প্রাসঙ্গিক :
‘‘এটিলার কালো ঘোড়া ছুটে চলে ক্ষিপ্র খুরধ্বনি
তছনছ করে দেয় সভ্যতার সোনালি হাতল
সুপ্রাচীন মন্যুমেন্ট ; নিসর্গের চোখের কর্নিয়া,
কেঁপে ওঠে দীর্ঘশ্বাস পৃথিবীর সজ্জিত সংলাপ’’।
তবে কবি আশাবাদী শান্তি এক দিন আসবে পৃথিবীতে :
‘পৃথিবীতে ভেসে আসে সমুদ্রের পাখি, জ্যোতির্ময়,
 নাগরিক, প্রজাপতি অরণ্যের উজ্জ্বল উৎসবে’।
কবির যুদ্ধ অন্যায়ের বিরুদ্ধে, সমগ্র ভণিতার বিরুদ্ধে। সত্যের পক্ষে সদাজাগ্রত কবি, সক্রেটিসের সাথে নিজের একাত্মতা ঘোষণা করেন :
আর আমি সক্রেটিসের হেমলকের পেয়ালা হাতে
তোমাদের কবরের পাশে গিয়ে তোমাদের
স্তবগান করি চিরজীবিতের
(আমার যুদ্ধ : হেমলকের পেয়ালা)
দুঃখ কবিতায় একটি পুরাতন প্রসঙ্গ। কিন্তু জীবনতো দুঃখ-কষ্ট ছাড়া হয় না, আর তাই আল মুজাহিদীর কবিতায় দুঃখ একটি উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করে আছে। কবির ভাষায় :
‘দুঃখও নিঃশেষিত হয় না কখনো।
দুঃখ। ও বড়ো নাছোড় বান্দা। কাউকে রক্ষে দেয় না।
দুঃখ কোন প্রদীপের নেভানো সলতে নয়’
[দুঃখ কোন নেভানো প্রদীপ নয়, প্রিজনভ্যান]
আল মুজাহিদীর কবিতায় বাংলাদেশ, দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসার কথা বারবার এসেছে, কিন্তু কবি তার উপস্থাপনাকে স্লোগানে পরিণত করেননি। সংহত শব্দমালায় দেশমাতৃকার কথা বিধৃত করেছেন। তার সব কবিতা যেন মৃক্তিকায় এসে প্রকৃত নিবাস খুঁজে পেয়েছে। মৃত্তিকাতেই তিনি দেখতে পান অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ। এই পৃথিবীর মৃত্তিকাচেতনা তাকে শেষপর্যন্ত দার্শনিকে পরিণত করেছে :
পৃথিবীর পথ-পৃথিবীর পরও আরো পৃথিবী আছে;
তোমার প্রান্তসীমার কাছে;
তুমি কোন্দিকে যাবে কোন্ পথের রেখার শেষে
খুঁজে পাবে তোমার জগৎ?
চক্রনেমি থেমে নেই তবু- জীবনের দ্রুতযান
দ্রাঘিমার দীর্ঘপথ পরিক্রমা শেষে জেগে ওঠে প্রাণ।
(চক্রনেমি : মৃত্তিকা, অতিমৃত্তিকা)
আল মুজাহিদী কবি, যেখানেই থাকেন না কেন প্রিয় মাতৃভূমির কথা কখনো ভুলেন না, ভুলতে পারেন না। স্বদেশভূমি তার অন্তরে বাজায় দারুণ মেলোডি, জীবনের কনসার্ট। সীমান্তের বেড়াজালঘেরা এই স্বতন্ত্র মৃত্তিকা তার কাছে আশ্চর্য গ্রীবার সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত রমণী
‘‘অরণ্যে, উদ্যানে, পাখির পালকে
আমি আজীবন বন্দী… অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে তোমার ;
তুমি গোটা মানবজাতির অস্তিত্ব স্পন্দন
আমি আজ তোমার কাছেই ফিরে আসি
পদ্মা মেঘনা যমুনা বিধৌত পলল ভূমিতে
আমিই তোমার অখণ্ড গতির
মহাকাব্য ’’।
(মৃত্তিকা, অতিমৃত্তিকা : মৃত্তিকা অতি মৃত্তিকা)


পুরস্কার:

    জীবনানন্দ দাশ একাডেমী পুরস্কার;
    কবি জসীমউদ্দীন একাডেমী পুরস্কার;
    মাইকেল মধুসূদন একাডেমী পুরস্কার;
    শেরে বাংলা সংসদ পুরস্কার;
    জয়বাংলা সাহিত্য পুরস্কার;
    একুশে পদক (২০০৩)।